কালোকাপড়ে ঢেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অবমাননা, দখল ও অবজ্ঞার প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধারা বিক্ষোভ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রোববার বেলা ১১ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। তাঁরা শহীদ মিনারকে কালো কাপড়ে ঢেকে শহীদ মিনারের অবজ্ঞার প্রতিবাদ জানান। এর আগে একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালে তৈরি সুনামগঞ্জ শহীদ মিনারটি মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার। সেই থেকে প্রতিবছরই এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় দিবসসমূহে শহীদদের স্মরণে শ্রদ্মা জানানো হয়।
শহীদ মিনারের পাশে পূর্ব পাকিস্তান আমলে মুনসেফ সাহেবের বাসভবন ছিল। এই অজুহাতে সম্প্রতি শহীদ মিনার এলাকায় কাঁটাতার দিয়ে সীমানা সংকুচিত করা হয়েছে। শহীদ মিনার এলাকায় অস্থায়ী টিনশেডের দোকানকোঠা করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। শহীদ মিনারের জমির দখল টিকিয়ে রাখার জন্য জেলা জজ আদালতের নাজিরকে বাদী সাজিয়ে এখানে শহীদ মিনারের অস্তিত্ব অস্বীকার করে স্বত্ব মামলা (নম্বর ১৪৪/২০১৪) দায়ের করা হয়। এটি শহীদ মিনার উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র। স্বাধীন দেশের প্রথম শহীদ মিনার, অর্থাৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনার কথা মামলায় উল্লেখ করা হয় নি। এই সম্পত্তির মূল মালিকানা গণপূর্ত অধিদপ্তরের। অথচ শহীদ মিনারের পশ্চিম পাশে দোকানকোঠা নির্মাণ করে জজকোর্টের কর্মচারীগণ ভাড়া আদায় করছে।
মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে শহীদ মিনার এলাকায় থাকা সকল বাণিজ্যিক স্থাপনা অপসারণসহ ৬ দফা দাবির কথা স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেন।
এগুলো হচ্ছে, শহীদ মিনারের চারপাশে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, আগামী ২৬ মার্চের পূর্বেই সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের দোকানকোঠাসহ সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, একই সময়ের মধ্যে জেলা জজের নাজির বাদী হয়ে দায়েরকৃত স্বত্ব মামলা (নম্বর ১৪৪/২০১৪) বাতিল, গেল ২ বছরে অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জেলা জজ আদালত সুনামগঞ্জে নিয়োগকৃতদের নিয়োগ বাতিল করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, পুরাতন আদালত এলাকা থেকে অবৈধভাবে স্থাপিত গরুর খামার, দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, গোদাম, গ্যারেজ উচ্ছেদ, কাঠের পাঠাতনের উপর নির্মিত পরিত্যক্ত পুরাতন জেলা জজ আদালত ভবনকে সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপির অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে, মাননীয় প্রধান বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবগণকে।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঘণ্টাব্যাপি অবস্থান গ্রহণ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন- মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার নুরুল মোমেন, সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ান, সদর উপজেলার সাবেক কমান্ডার আব্দুল মজিদ, মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা সফর আলী, মুক্তিযোদ্ধা আপ্তাব উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান জুনেদ আহমদ, ওবায়দুর রহমান কুবাদ প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি চলবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি’র কাছেও এসব বিষয় তুলে ধরে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার রক্ষায় হস্তক্ষেপ কামনা করা হবে।
এ প্রসঙ্গে রোববার দুপুরেই জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিশ^জিৎ চৌধুরী’র পাঠানো লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতের পুরাতন মুন্সেফ বাসভবনের একাংশের জায়গার উপর ১৯৭১ সালে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হয়ে অদ্যাবধি সগৌরবে বহাল আছে। এ স্মৃতিস্তম্ভের সম্প্রসারণ তথা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বৃদ্ধির নিমিত্ত মৌখিক আবেদনের এবং সুপারিশের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ২০১৫ সালের ১৩ মে’ এর (১০.০০.০০০০.১২৯.২৭.০১৮.১৪-৫০৩ নং স্মারক মূলে) প্রেরিত নির্দেশনামার আলোকে উপর্যুক্ত পরিমাণ জমির বরাদ্দ ও সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং তাদের দ্বারা তৈরীকৃত স্মৃতিস্তম্ভের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান রয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের আশেপাশে এমন কোন কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়নি। যাদ্বারা উহার সম্মান ও ঐতিহ্য সামান্যতম ম্লান হতে পারে। পুরাতন মুন্সেফ বাসভবনের স্মৃতিস্তম্ভ ব্যতিরেকে বাকী অংশের জায়গা নিয়ে সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সদর, সুনামগঞ্জ-এ স্বত্ব-১৪৪/২০১৪ নম্বর মামলা বিচারাধীন আছে।
উল্লেখ্য, পুরাতন মুন্সেফ ভবনের জায়গায় কিছু অসাধু ব্যক্তি ৮ টি দোকান ঘর নির্মাণ করলে উক্ত বিষয়টি জেলা জজ মহোদয়ের গোচরীভূত হওয়ায় উক্ত দোকান ঘর সমূহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভেঙে দেয়া হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বর্ণিত নির্দেশনার আলোকে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত জায়গা সুরক্ষার জন্য জেলা জজ মহোদয় উপর্যুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রেক্ষিতে কিছু সংখ্যক কুচক্রী মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। জেলা জজশীপের আওতাধীন সরকারী সম্পত্তি রক্ষা করা জেলা জজের পবিত্র দায়িত্ব। উক্ত সম্পত্তি সংক্রান্তে মোকদ্দমা বিচারাধীন থাকাবস্থায় সে বিষয়ে কোনরূপ মিছিল, সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা আদালত অবমাননার সামিল। এ বিষয়ে মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ে অবগত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
পুরাতন মুন্সেফ বাসভবনের জমিতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বাসভবন নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে খোলামেলা জায়গা থাকার কারণে তা নিয়ে নানা ধরণের সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার দরুন এবং স্থানীয় দুষ্টু ও কুচক্রী মহলের জমি আত্মসাতের লোলুপ দৃষ্টি পড়ার আশংকায় জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা তৈরী না হওয়া পর্যন্ত উপর্যুক্ত জায়গায় অস্থায়ীভাবে ছোট খাট স্থাপনা তৈরী করা হয়েছে। স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা প্রকল্পের কাজের প্রাক্কালে এসব স্থাপনা তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে দিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। নিছক উপর্যুক্ত সম্পত্তির দখল রক্ষার সুবিধার্থেই এসব স্থাপনা করা হয়েছে। এগুলি কোন স্থায়ী বা ইমারত দ্বারা নির্মিত কোন স্থাপনা নয়।