কালোর ভিতরের আলো দেখার মনশ্চক্ষুর উন্মীলন হবে কবে?

রবি ঠাকুর গানের বাণীতে বলেছিলেন, ‘কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক/মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে/কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।’ কবি রবি ভাবুক, তিনি সর্বত্র সৌন্দর্য অনুসন্ধান করেন। রূপময় পৃথিবীর সবকিছুর ভিতর শুভ ও সুন্দর সত্ত্বার যে প্রাচুর্য, তিনি তাই নিংড়ে বের করে আনতে পারঙ্গম। সাধারণ মানুষের এতোটা গভীর উপলব্ধির ক্ষমতা নেই। নেই বলে সে বৃত্তের বাইরে যেয়ে কালোর ভিতরের আলোর খোঁজ পায় না। যেমন পায়নি জগন্নাথপুরের কবিরপুরের এক যুবক। সে বিয়ে করেছিলো এক কালো মেয়েকে। কিন্তু বিয়ে করা বউ’র গায়ের রঙ কালো বলে বিগড়ে যায়। মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে নববিবাহিতা স্ত্রীর উপর। মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে নানা ধরনের উপহারসামগ্রী দিয়েও তার মন গলানো যায়নি। বিয়ের ৬ মাসের মাথায়ই মেয়েটির ঠিকানা হয় বাপের বাড়ি। নির্যাতিতা নারী স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার রায় হয় ৩ বছর পর। আসামীর প্রতি দেনমোহর ও খোরপোষ বাবদ এককালীন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ও প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে দেয়ার আদেশ দেন আদালত। কিন্তু আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় নির্যাতক স্বামী এখন শ্রীঘরে আটকা পড়েছেন। ঘটনার এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে এক বঁধুর নির্মম আখ্যানের খুব সামান্যই জানা যায়, তার জীবনের অব্যক্ত কান্নার কোনো কিছুই এই বিবরণের মধ্য দিয়ে বুঝা আদৌ সম্ভব নয়। যার বুঝার কথা ছিলো সবচাইতে বেশি সেই অতি সাধারণ পুরুষ প্রবরটি চোখে ঠুলি এঁটে তথাকথিত কিছু অপ-ধারণার শিকার হয়ে অন্ধ সেজে আছে। তার কাছে সৌন্দর্যের মানে হলো নারীর গায়ের রঙ। গায়ের রঙ যে একটি জন্মগত প্রক্রিয়া এবং এর উপর মানুষের আদতে করার কিছু থাকে না সেই বোধ ও বুদ্ধি তার নেই। এক নারীর হৃদয়ের আর্তি অনুভব না করে তার প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের তপ্ত লাভা ছড়িয়ে সে তাকে নিষ্ঠুরভাবে পুড়িয়ে দিতে চেয়েছে। ওই অন্ধ পুরুষের প্রতি আমাদের কোনো সহনাভূতি নেই। তার নির্দয় ও কূপম-ুক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি কেবল আমাদের ধিক্কার।
নারীর প্রতি এক ধরনের বৈষম্যপূর্ণ ধারণা তৈরি করে রেখেছে এই পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থা। এই ধারণার মূলে হলোÑ নারী কেবলই এক ভোগ্যবস্তু। ভোগ্যবস্তুর বাইরে নারী হলো বিনা পয়সার কামলা। এর বাইরে নারীকে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করার মানসিকতা এই সমাজে গড়ে উঠেনি। এবং এই ধারণাগুলোকে যতেœর সাথে লালন করা হয়ে থাকে। লোকসাহিত্য থেকে ধর্ম-সাহিত্য হয়ে নাগরিক সাহিত্য; সর্বত্র নারীর প্রতি এই একপেশে মনোভাব ও বিদ্বেষের তীব্র প্রকাশ দেখতে পাই। ফলে গায়ের রঙের কারণে, সন্তানাদি জন্ম দিতে ব্যর্থ হবার কারণে, অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে না পারার কারণে; কত নারীর জীবন নিরবে নিভৃতে ছারখার হয়ে যায় সে খবরও আমরা জানি না। কবিরপুরের ওই নারী সাহসী হয়ে আদালত পর্যন্ত আসতে পেরেছেন বলে তার কষ্টকাহিনী বাইরে এসেছে। এরকম আর ক’জন নারী করতে পারে? নারীর মানবিক সত্ত্বার উদ্বোধনে ও তাকে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করার দাবি জানিয়ে সমাজের অগ্রসর একটি অংশ তৎপর থাকলেও তার রেশ সমাজের একেবারে গভীরে যেয়ে এখনও সেরকম কোনো স্পন্দন তৈরি করতে পারেনি। পারেনি বলেই এক পুরুষ গায়ের রঙের কারণে নিজের স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারে। এই শক্তি সঞ্চয়টি করেছে সে সমাজের ভিতর থেকে। সুতরাং কবিরপুরের ওই পুরুষটিই কেবল দোষী নয় বরং হীনমন্য এই সমাজ মানসও সমান দায়ী এ জন্য।