কিশোর আবেগকে বিপথে পরিচালনার কূটচালের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে

লক্ষ্যহীন যে কোন আন্দোলন বিপথগামী হতে বাধ্য। ওই আন্দোলন লক্ষচ্যুত হয়ে নানা রকমের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হয়ে উঠে তখন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারা দেশে যে ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব কিশোর ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে তার পরিণতি নিয়ে এ কারণেই আমরা শংকিত। এই আন্দোলনটি গড়ে উঠেনি কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায়। এই আন্দোলনে নির্দিষ্ট কোন নেতা নেই। স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্র নিয়ে কিশোর মনের অদম্য আবেগে মথিত হয়ে সারা দেশকে কাঁপিয়ে তুলেছে এই ছাত্র আন্দোলন। লাগাতার চেষ্টা করেও যে সড়ক দানবের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ দায়িত্বশীল কোন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়, সড়কে বিদ্যমান অনিয়মের পাহাড় যা এতদিন চক্ষুসহা হয়ে গিয়েছিল, যে দুর্বিনীত সড়ক সেক্টরের কিছু অতি মুনাফালোভী মানুষের লোভের বেপরোয়া মাত্রা কমাতে পারেনি কেউ; আমাদের কিশোর ছাত্র-ছাত্রীরা এই ক’দিনে তা করে দেখাতে পেরেছে। বড়রা লজ্জা পেয়ে কোথায় মুখ লুকাবেন সেই পথ পাচ্ছেন না। সড়কের শৃঙ্খলা কী, তা ব্ল্যাকবোর্ডে শিক্ষকরা যেরকম হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেন, সেরকম করে কোমলমতি শিশুরা সারা দেশকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। দেশের প্রতিটি মানুষ এই অদম্য কিশোর দলের বৈপ্লবিক উত্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন। ¯েœহসিক্ত করেছেন পরম মমতা ভরা বুক নিয়ে। আন্দোলন সফলতা অর্জন করেছে। তারা যেসব দাবি তুলেছিল তার সবগুলোই মেনে নেয়া হয়েছে সরকারিভাবে। এ দেশের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে ২০১৮ সনের এই বয়স আঠার’দের বিদ্রোহের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয়ার পরও রবিবার অষ্টম দিনের মত শিক্ষার্থীরা রাজপথ দখল করে ছিল। কেন ছিল, এই প্রশ্নের কোন সুষ্পষ্ট উত্তর নেই। আন্দোলনকারীদের কেউই যুক্তি উপস্থাপন করে তাদের রাজপথে বর্তমান অবস্থানের কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারছেন না। এরই মধ্যে এই আন্দোলনে কিশোর শিক্ষার্থীদের সাথে যুক্ত হয়েছে বড় ভাই শিক্ষার্থীরাও। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাজধানীর সড়কে সরব হয়ে উঠেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাচ্ছেন, ইন্ধন জুগাচ্ছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কিশোরদের এই আন্দোলনটি এখন পথভ্রষ্ট হতে চলেছে। শুরুতেই বলেছিলাম, লক্ষ্যহীন আন্দোলন একসময় বিভিন্ন উদ্দেশ্যমুখী হয়ে উঠে। কিশোররা যে আগুন জ্বেলেছে সেই আগুনে আলু পুড়ে খাওয়ার লোকের অভাব হচ্ছে না এখন। তাই নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে নিষ্পাপ ও পবিত্র আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল তা হয়ে উঠেছে এখন লক্ষ্যবিহীন, অন্তত ঘোষিত কোন লক্ষ্যের খোঁজ পাচ্ছি না আমরা। এটি যেন এখন সরকার বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।
আমরা জানি সামনের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য আছে কিছু দল ও গোষ্ঠীর। রাজনীতিতে এরকম রাজনৈতিক আন্দোলন খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার বিরোধী আন্দোলন যখন কেউ নিজস্ব ব্যানার বা পরিচয়ে করতে না পেরে নিরীহ ও কোমলমতি শিশু কিশোর শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে সওয়ার হতে চান তখন সেই তৎপরতা হয়ে উঠে চরম অনৈতিক ও ভ্রষ্টাচারের পরাকাষ্টা। সরকারকে টেনে নামাতে চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অবস্থান থেকে সেই আন্দোলন পরিচালনা করাই গণতান্ত্রিক রীতি। এর ব্যত্যয় মানেই নিজেদের সার্বিক ব্যর্থতার পরিচয় ফুটিয়ে তোলা। আর এই কাজটিই হচ্ছে এখন। কিশোর মনের আবেগকে বিপথে পরিচালনা করার এই রকমের কূটচালকে আমরা নিন্দা জানাই।