কৃষকদের জন্য শস্য ব্যাংক স্থাপন করা যেতে পারে

রোকেস লেইস
প্রতিটি হাওর এলাকার কৃষকগণ সমন্বিত হয়ে নিজেদের উৎপাদিত ধান মওজুদ করে ‘ধান ব্যাঙ্ক’ বা ব্যাপক অর্থে ‘শস্য ব্যাঙ্ক’ সৃষ্টি করতে পারেন, কারো ৫০ কারো ১০০ কারো ৫০০ মণ বা ততোধিক ধান বা ফসল একত্রিত করে। সর্বাবস্থায়, ঐ ব্যাঙ্ক থেকে ধান’ বা শস্য বিক্রয় হলে, আনুপাতিক হারে এবং প্রয়োজনের গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার নিরূপণ দ্বারা প্রতি কৃষককে মূল্য পরিশোধ করার ব্যবস্থা থাকবে।
এরূপ ক্ষেত্রে কৃষি ব্যাঙ্ক উদ্যোগী হতে পারেন।
সার্বিক অর্থে কৃষি উন্নয়নর প্রতি লক্ষ্য রেখেই ১৯৭৩ সনে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আদেশবলে (রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৭, ১৯৭৩) একটি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষি ব্যাংক।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ও মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল কৃষি সমৃদ্ধির নিমিত্তে অর্থ আনুকূল্য দ্বারা কৃষক বান্ধব তথা কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি, সেই সাথে কৃষি নির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ।
তথাকথিত কৃষি ঋণ যা কৃষককে প্রকারান্তরে সর্বশান্ত করছে, করছে নির্মূল; সেরকমটি নয়। কৃষককে নিঃশেষ করে মুনাফা লুঠছে ব্যাঙ্ক। যদিও, এমনটি হওয়ার কথা ছিলো না। কৃষি ব্যাঙ্ক কৃষক নির্মূলে নয়, অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছিলো কৃষক বান্ধব অনুকুল সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে, কৃষক তথা কৃষি’র পাশে দাঁড়ানোর মহৎ ব্রত নিয়ে। কিন্তু, অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে লক্ষণীয় কৃষি সহায়ক না হয়ে, বৃটিশ বেনিয়া শিক্ষা তথা বৃটিশ বুর্জুয়া ধ্যান ধারণা পোষণে মুনাফা লাভের লোভে, নীতি আদর্শ বিবর্জিত আর দশটা মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানের সর্বকর্মকান্ড আচার আচরণের দ্বারা শুষে নেয়া হচ্ছে কৃষকের জমি-ভিটা সর্বস্ব। যে মূলনীতি বা আদর্শে প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্ট, যার মুখ্য উদ্দেশ্য কৃষক বান্ধব পরিবেশ তৈরী, কৃষক তথা কৃষি সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক আবহ সৃষ্টির মাধ্যমে দৃঢ়, মজবুত কৃষিপণ্য উৎপাদনমুখি ভিত্তি গড়ে তোলা। সার্বিক অর্থে যখন সহজ অর্থানুকূল্যে কৃষিপণ্য উৎপাদন সহায়ক অবকাঠামো গড়ে উঠবে, প্রকারান্তরে লাভবান হবে প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ কৃষি ব্যাঙ্ক, সেই সাথে প্রান্তিক কৃষক, তথা কৃষিনির্ভর দেশীয় অর্থনীতি।
বিষয়টি অত্যন্ত সাদামাটা ভাবে লক্ষণীয় যে, কৃষক প্রায় প্রতি মৌসুমে ফসল বুননের প্রস্তুতি কালেই স্থানীয় লগ্নিকারকদের নিকট থেকে আদি বর্গা (ংঁনষবধংব) পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহ করে বা করতে বাধ্য হয়। আর ফসল উৎপাদিত হওয়া মাত্রই পৌঁছে দিতে হয়, অর্থ লগ্নি দাতার ভাঁড়ালে; কৃষকের ঘরে উঠার আগেই। ফলশ্রুতিতে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষকের ঋণগ্রস্ততা থেকেই যায়, যা পরবর্তী বছর বা বছরকে বছর চলতেই থাকে। যদি, গ্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা, খরা বা অনাবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পোকামাকড় বা অন্য কোনো কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়, ঐরূপ ক্ষেত্রে পুরোটাই ধরা অর্থাৎ লগ্নিকারক সামান্যতম ছাড় না দেয়ায় পরবর্তী বছর বা বছর সমূহ ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় কৃষক হয় সর্বশান্ত, নিঃস্ব। ফলস্বরূপ ভিটা-জমি হস্তান্তর করে পারি জমাতে বাধ্য হয় বেকারত্বের ঠিকানায়, দৈনন্দিন কায়িকশ্রমের অনিশ্চিত অজানায়, মৃত্যু হয় কৃষক’র।
অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষণীয় কৃষিঋণ সহজ শর্তে সহজ প্রক্রিয়ায় প্রদানের সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতা বিষয়টিকে শুধু জটিলই করে নাই করেছে ভীতিপ্রদও। স্থানীয় লগ্নিকারকদের মতোই প্রায় একই ভূমিকায় শুধুমাত্র মুনাফা অর্জন যেহেতু কৃষি ব্যাঙ্ক এর লক্ষ্য নয়,
সেক্ষেত্রে জমির মালিকানা যাচাই ও কৃষক পরিচিতির জন্য স্থানীয় মেম্বার / চেয়ারম্যান বা গণ্যমান্য ব্যক্তি দ্বারা সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া পরিহার, নিজস্ব প্রতিনিধি বা বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা ব্যবহারিক শিক্ষা-কার্যক্রম এর সহিত সম্পৃক্ত করণে প্রোগ্রাম সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে স্থায়ী কৃষক এবং বর্গাচাষীদের সাকুল্য ডাটা অর্থাৎ তথ্যাদি স্থায়ীভাবে সংগ্রহ সহ, একটি নির্দিষ্ট এলাকার জমির পরিমাণ, প্রতিটি জোতদার বা মালিকের অংশ পরিমাণ ভূমির তথ্যাদি প্রাথমিকভাবে সংগ্রহ করা হলেই ; যেকোনো ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে অন্য কারো সহায়তা ছাড়াই, ঋণ আবেদনকারীর যাবতীয় তথ্যাদি যাচাই শুধু সহজতরই হবে না সময়ক্ষেপণ, তথ্য বিভ্রাট,পরিচয় জালিয়াতি বা প্রতারণার বিষয়সমূহ প্রায় নির্ভুলভাবে যাচাই-বাছাইও সম্ভব হবে, সেইসাথে অর্থ ও সময় দুটোরই অপচয় রোধও সম্ভব হবে। প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঋণ প্রদান ও উত্তোলনও করা যেতে পারে। কৃষক বা বর্গাচাষি সহজ প্রক্রিয়ায় ঋণ প্রাপ্ত হলে পরিশোধের ক্ষেত্রেও আগ্রহী হবেন, এমনিতেও প্রকৃত কৃষক বা চাষি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নয়ছয় করেন না।
ফসল উৎপাদিত হওয়ার পরই প্রত্যেক ঋণ গ্রহীতা উৎপাদিত ফসল, খোরাকী বাদে পরিমাণ উল্লেখে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিপিবদ্ধ করিয়ে নিবেন অর্থাৎ শস্য বা ধান ব্যাঙ্কে জমা করে দিবেন। যদিও, প্রকৃতবস্থায় ধান বা ফসল কৃষকের ভাঁড়াল বা গোলাতেই থাকবে।
সরকারি ক্রয় নীতিমালার আলোকে ব্যাঙ্ক-এ জমাকৃত ফসল সরকারি গুদামে পৌঁছে দেয়ার নিমিত্তে, ব্যাঙ্ক আনুপাতিক হারে কৃষকদের টোকেন বা স্লিপ দিবেন। সেই টোকেন মোতাবেক ফসল সরকারি সংগ্রহশালায় পৌঁছে দেয়ার পর, কৃষক বা বর্গাচাষি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে নগদ মূল্য গ্রহণের টোকেন পাবেন । সরকারীভাবে ক্রয়কৃত লক্ষ্যমাত্রা পরিমাণ ধানের মূল্য, স্লিপ বা টোকেন প্রদানকারী নির্দিষ্ট ব্যাঙ্কে নির্দিষ্ট খাতে পূর্বাহ্নেই জমা হয়ে থাকবে, সেই খাত থেকে ভিন্ন ভিন্ন কৃষক নিজ নিজ বিক্রিত ফসলের মূল্য আনুপাতিক হারে পর্যায়ক্রমিক এক বা একাধিক কিস্তিতে ঋণ কর্তন সাপেক্ষ নিজ নিজ একাউন্ট থেকে পেয়ে যাবেন। ডিজিটাল অগ্রগতির এই সময়ে প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনা দাঁড়িয়ে গেলে মধ্যস্বত্বভোগী বা তৃতীয়পক্ষের অবলুপ্তি অনিবার্য। এরূপ ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ ধান’ বা শস্য’ বা ফসল’ ব্যাঙ্ক কার্যক্রম শুরুর ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশ কর্মচারী ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারিক শিক্ষা-কার্যক্রম এর আওতায় সম্পৃক্ত করে মাঠ পর্যায়ে মোটিভেট বা অনুপ্রাণিত করার কাজেও নিয়োজিত করে প্রচার প্রচারণা দ্বারা জনমত সৃষ্টি, সেই সাথে প্রচার মাধ্যমগুলোতেও প্রচারণার দ্বারা স্কিম বা প্রজেক্টের উপকারিতা তুলে ধরার ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রস্তাবিত পর্যায়ে একটি কাঠামো দাঁড়িয়ে গেলে কৃষক তথা কৃষি অবকাঠামো তৈরী হওয়ার সাথে সাথে সমবায় ভিত্তিক বা সমবায় নির্ভর কৃষি ব্যবস্থারও দিক উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। কৃষি উন্নয়নে যারা নিরত মেধা ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন ‘ধান ব্যাঙ্ক’ বা ‘শস্য ব্যাঙ্ক’ প্রস্তাবিত উপায়ে বা আরো যুগোপযোগী উপায়ে চালু করার দ্বারা সুফল প্রাপ্তি বিষয়ে ভাববেন বা ভাবা উচিত।
২৭০৯১৯

লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কবি।