কৃষকের ব্যস্ততায় মুখরিত ছাতকের হাওরাঞ্চল

বিজয় রায়, ছাতক
ছাতকে বোরো ধান কাটাকে কেন্দ্র করে কিষাণ-কিষাণীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে হাওরাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদ। হাওর জুড়ে চলছে ধান কাটার উৎসব। গত বছর এমন সময় বিষাদে তিক্ত ছিল হাওর পাড়ের মানুষ। অকাল বন্যার পানিতে থৈ-থৈ করছিল হাওরে পর হাওর। ফসলহারা মানুষের কান্না ও অবিরাম বৃষ্টিধারা একাকার হয়ে গিয়েছিল। চলতি মৌসুমে হাওর জুড়ে বইছে ঠিক বিপরীত দৃশ্য। কৃষক-কিষাণীদের কর্ম ব্যস্ততায় এখন হাওরে-হাওরে বইছে বাংলার চিরাচরিত দৃশ্য। একদিকে বাম্পার ফলন অন্যদিকে ফসল হারানোর সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাওয়ায় কৃষকরা ধান কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই ও ধান গোলায় তোলার কাজে এতটুকু সময় নষ্ট করতে নারাজ। দিবা-রাত্রি রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কৃষক পরিবার হাওড়ে ত্রিপালের তাবু টানিয়ে বোরো ফসল ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। হাওরে-হাওরে সোনালী-সবুজের সমাহার যেন দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে। হাওরের কাঁচা-পাকা ধানের মৌ-মৌ এমন গন্ধ ও অপরূপ দৃশ্যে মুগ্ধ হয়েই কবি জীবনান্দ দাস এ দেশকে বলেছিলন রূপসী বাংলা এবং রবি ঠাকুরের সোনার বাংলা। কবি যথার্থই বলেছেন, ‘এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে।’ টানা দু’বছর বোরো ফসল হারা কৃষকরা এখন আর পেছনে ফিরতে চায় না। তারা সময়ের আগেই ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত। কাটা ধান খলায় এনে মাড়াই-ঝাড়াই শেষ হলেই ধান এবং গো-খাদ্য খড় শুকানোর কাজ চলছে হাওরপাড়ে। উপজেলা প্রত্যকটি হাওরে বোরো ফসল কাটার ধুম পড়েছে। ধান কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই, ধান ও খড় শুকানো, খলায়-খলায় খড় ও ত্রিপালের তাবু, তাবুর ছায়ায় এক সাথে বসে কৃষক পরিবারের খাবারের দৃশ্য এখন হাওর জুড়ে বিদ্যমান। ফলন ভালো হওয়ায় কিষাণ-কিষাণীরা এখন আনন্দে মাতোয়ারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় উপজেলা নাইন্দা, ডেকা ও চাউলীর হাওরে ৭টি পিআইসি গঠনের মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করায় চলতি মৌসুমে কৃষকরা অনেকটা স্বস্তিতে ছিল। এ ছাড়া জাউয়া ইউনিয়নে বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয় আরো ৫টি ছোট-বড় বাঁধ।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এখানে বোরো চাষাবাদের লক্ষ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ১৩ হাজার ৭৯৮ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে উপশী জাতীয় ধান চাষ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৭৬৮ হেক্টর, হাইব্রিড চাষ করা হয়েছে ৮৮০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের টেপু, গর্চি, গাছমাল চাষাবাদ করা হয়েছে ১৫০ হেক্টর জমিতে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম বদরুল হক জানান, চলতি মৌসুমে বোরোর ফলন খুবই ভাল হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে কৃষকদের। ঘন-ঘন প্রশিক্ষনের মাধ্যমে কৃষকদের আরো দক্ষ ও সচেতন করা হয়েছে। এক বিঘা জমি চাষাবাদের জন্য কৃষি পুনর্বাসনের আওতায় উপজেলার ১৮ হাজার ৭৬৬ জন কৃষককে বীজ, সার ও নগদ ১হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। চলতি মৌসুমে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উপর সরকারের কঠোর নজরদারি ছিল। আগাম বন্যায় ফসলহানীর সম্ভাবনা অনেকটাই কেটে গেছে।
উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ জানান, উপজেলার হাওরগুলোতে ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগামী ১৫-১৬দিনের মধ্যে কৃষকরা তাদের কাংখিত ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।