কৃষিতে অধরা থাকছে নারী শ্রমের মূল্য

পর্ব ১
এনামুল হক এনি
আজ ‘বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস।’ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। তবে কাইঞ্জার হাওরপাড়ের ছোট্ট গ্রাম কান্দাপাড়ার নারী রুহুলা আক্তারের কাছে এ দিবসের কোনো ব্যাখ্যা নেই। তিনি এ দিবস সম্পর্কে আগে শুনেছেন বলে মনে হলো না। গ্রামীণ এ নারীর স্বামী সিরাজ তালুকদার কান্দাপাড়া গ্রামের বড় গৃহস্থদের একজন। ভালভাবে বোরো ফসল ঘরে তুলতে পারলে হাজার মণ ধান গোলায় ওঠে তাঁর। তবে এ কৃতিত্ব যেন শুধুমাত্র পরিবারের পুরুষ সদস্যদের। এতে রুহুলা আক্তারের অবদান মানতে নারাজ তাঁর সন্তান সুমন মিয়া। যুবক সুমনের দাবি, কৃষিতে তাঁর মায়ের বা পরিবারের অন্য নারী সদস্যের কোনো ভূমিকা নেই।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে যখন রুহুলা আক্তারের সাথে কথা হয় তখন তাঁকে ভীষণ ব্যস্ত দেখাচ্ছিল। তাঁর স্বামী বাড়ির বাইরে আছেন। সকাল থেকে তিনি গৃহস্থালী অনেক কাজ সেরেছেন। তিনি তাঁর হাতের কাপড় চোপড় দেখিয়ে বুঝালেন গোসল করতে যাচ্ছেন তিনি। গোসল শেষ করে এসে পরিবারের সদস্যদের খাবার বেড়ে দেওয়ার কাজটিও তাঁকে করতে হবে। মাঝে মধ্যে যদি রান্না করতে বা খাবার বেড়ে দিতে দেরি হয় তখন স্বামী বা সন্তান রেগে গিয়ে বলে ওঠেন ‘কিতা করছো অতক্ষণ?’ মায়ের এমন সহজ স্বীকারোক্তিতে পাশে বসে থাকা সুমন কিছুটা লজ্জা পেলেন। তিনি তাঁর মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে বললেন, ‘মাইধ্যে মাইধ্যে আওর (হাওর) থাইক্যা আইয়া যহন দেহি খাওন অইছে না তহন রাগের মাথায় এমনডা কইয়ালাই। এমনডা উচিত না।’ সুমনের বাবাও কি মাঝে মধ্যে এমনটি করেন? রুহুলা আক্তার তাঁর সহজ সরল ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাবে বিষয়টি স্পষ্ট করলেন।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সদর ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের পঁয়তাল্লিষোর্ধ বয়সী নারী রুহুলা আক্তারের সকাল শুরু হয় পরিবারের লোকেদের জন্য রান্নাবান্নার কাজ দিয়ে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ছেলেরা গোয়াল ঘর থেকে ২০টি গরু হাওরে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁকেই গোয়াল ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করতে হয়। বৈশাখ মাসে যখন হাওরের ফসল ঘরে তোলার কাজ শুরু হয় তখন তাঁকে ভোরে ঘুম থেকে ওঠতে হয়। রান্নার কাজ শেষ করে যেতে হয় খলা’য় (ধান মাড়াই ও শুকানোর জন্য বিশেষ জায়গা)। রোদ বাড়ার আগেই খলা ঝাড়– দেওয়ার কাজটি শেষ করতে হয়। তারপর ধান রোদে দেওয়া, শুকানো, চিটা থেকে পুষ্ট ধান ঝেড়ে আলাদা করা, খড় শুকানো, বিকেলে পুনরায় সেই ধান একসাথে জড়ো করা অথবা বস্তায় ভরা কিংবা বাড়িতে গোলায় তোলার কাজ করার পাশাপাশি দুপুরের ও রাতে খাবার তৈরি এবং পরিবেশন করার দায়িত্বও পালন করতে হয় তাঁকে। এ কাজে তাঁর সাথে পরিবারের অন্য সদস্যরা (নারী/পুরুষ) সহায়তা করেন। গত বৈশাখে ময়না বিবি নামের এক নারী তাঁর সহযোগী হিসেবে ছিলেন। রুহুলা আক্তারের এমন কাজ ‘অ-অর্থনৈতিক’ কাজ হিসেবে বিবেচিত হলেও ময়না বিবিকে এক মাস কাজের জন্য দৈনিক তিনবেলা খাওয়ানো ও ৭ মণ ধান পরিশোধ করতে হয়েছিল। যা ‘অর্থনৈতিক’ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কৃষিতে অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত নারীদের ক্ষেত্রে রয়েছে মজুরী বৈষম্য। ময়না বিবির স্থলে বৈশাখে একজন পুরুষ শ্রমিককে এক মাসের জন্য কাজে নিয়োজিত করলে ১৪/১৫ মণ ধান পরিশোধ করতে হয়। এমন কথা জানালেন, একই গ্রামের শহীদ মিয়া বেপারী। রুহুলা আক্তারের বাড়িতে যাওয়ার পথে দেখা হয় তাঁর সাথে। সেখানে উপস্থিত ধর্মপাশা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল মজুমদার জানালেন, তাঁদের গ্রামের ৭০/৭৫ শতাংশ নারী মাছ ধরার চাঁই তৈরির কাজের সাথে সম্পৃক্ত। এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত নারীরা গৃহস্থালী কাজের পাশাপাশি সারা বছর চাঁই তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু চাঁইগুলো বাজারে/বাড়িতে থেকে বিক্রি করার পর অর্জিত টাকা চলে যায় স্বামীদের হাতে। ফলে সেখানেও গ্রামীণ নারীর শ্রমের মূল্য অধরা থেকে যায়। যার প্রমাণ পাওয়া গেলো শহীদ মিয়া বেপারীর বাড়িতে গিয়ে।
সেখানে দেখা গেলো শহীদ মিয়া বেপারীর স্ত্রী হাসনা আক্তার (৪৩) ও শফিকুল ইসলামের স্ত্রী পদুনা আক্তার (৪০) শফিকুল ইসলামের ঘরের বারান্দায় বসে চাঁই তৈরির কাজ করছেন। সেখানে পদুনা আক্তারের এক মেয়ে তাঁদেরকে সহযোগিতা করছে। হাসনা আক্তার ও পদুনা আক্তার জানান, তাঁরা এই কাজ প্রায় ১০/১২ বছর ধরে করছেন। তাঁদের স্বামীরা বাজার থেকে বাঁশ এনে তা মাপ দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে দেন। তারপর সেই কাটা বাঁশের টুকরো দিয়ে চিকন শলা তৈরি, সুতা বুনাসহ পুরোপুরি একটি চাঁই তৈরির কাজ তাঁদেরকেই করতে হয়। এই শ্রমের বিনিময়ে তাঁদের জন্য কোনো মজুরীর ব্যবস্থা আছে কি না বা চাঁই বিক্রির টাকার কোনো অংশ তাঁদের হাতে পৌঁছায় কি না জানতে চাইলে হাসনা আক্তার কিছু বলতে গিয়ে তাঁর স্বামীর দিকে তাকালেন। পুরুষ শাসিত সমাজে এখনও গ্রামীণ নারীরা তাঁদের স্বামীর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শিখেনি। তাই হাসনা আক্তার কিছু বলার আগেই শহীদ মিয়া বেপারী বলে উঠলেন, ‘বেইট্টাইনের (নারী) আতো (হাতে) বেক (সব) ক্ষমতা দেওন নাই। যত টাইট দিয়া রাহন যায় ততই বালা (ভাল)।’ কিন্তু সুযোগ পেলে নারীরাও যে সত্যিটা বলতে ছাড়েন না তা বুঝিয়ে দিলেন সেখানে উপস্থিত নয়াবাড়ির পুষ্প আক্তার (৩৫)। তিনিও দীর্ঘ বছর ধরে চাঁই তৈরির কাজ করছেন কিন্তু শ্রমের বিনিময়ে কোনো মূল্য পাননি। চাঁই থেকে প্রাপ্ত আয়ের পুরোটাই স্বামীর দখলে থাকে। শুধু কান্দাপাড়া গ্রামে নয় পার্শ্ববর্তী রাধানগর, কেশবপুর, দেওলা, রাজধরপুর, জানিয়ারচর গ্রামেও চাঁই তৈরির কাজ করেন নারীরা। এ কাজের সাথে সকল নারীর শ্রম নিত্যদিনের সাংসারিক কাজের অংশ হিসেবে দেখা হয়। যার কোনো আর্থিক মূল্য তৈরি হয় না।
সভ্যতার সূচনালগ্নে মানুষ শিকার ও খাদ্য অন্বেষণ বা খোঁজ করার মাধ্যমে খাবার যোগাড় করতো। পুরুষেরা শিকার থেকে ২০ শতাংশ ও নারীরা খোঁজ করে খাবারের ৮০ শতাংশ যোগান দিতো। খাদ্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে গোলাজাতকরণ পর্যন্ত মোট ২৩টি ধাপের মধ্যে ১৭টি ধাপের সাথে নারী সরাসরি সম্পৃক্ত থাকে। তবুও নারীর অবদান ‘অ-অর্থনৈতিক’ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কার্তিক/অগ্রহায়ণ মাসে হাওরের পানি কমতে শুরু করে। ভেসে ওঠে বীজতলা। কৃষক জমিতে চাষাবাদ করে একদিকে বীজতলা তৈরি করেন। অন্যদিকে ওই কৃষক পরিবারের নারী সদস্য বীজ ধান বীজতলায় বপনের জন্য প্রস্তুত করেন কয়েকটি ধাপে। প্রথমে বীজধান একটি পানির পাত্রে ৮/১০ ঘন্টা চুবিয়ে রাখেন। পরে পানির পাত্র থেকে তুলে ডুলায় (বাঁশের তৈরি এক প্রকার ঝুড়ি সদৃশ পাত্র) রেখে দেন। বীজ থেকে ভালভাবে অংকুর বের হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দিন বীজ ধান ভর্তি ডুলা কয়েক ঘন্টা রোদে রেখে তাপ দিয়ে শুষ্ক স্থানে রাখেন। এভাবে ৪/৫ দিনের মধ্যে বীজ থেকে অংকুর গজায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে গ্রামীণ নারীরা বেশ পটু হাতে। আর এই কাজ দীর্ঘ বছর ধরে করে আসছেন রুহুলা আক্তারসহ অসংখ্য গ্রামীণ নারী।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪৯ ভাগ নারী যার শতকরা ৮৬ ভাগ গ্রামে বসবাস করেন। গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ নারীরা যেখানে দিনের মোট ৫৩ ভাগ সময় কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে ব্যয় করে সেখানে পুরুষেরা ব্যয় করে দিনের ৪৭ ভাগ সময়। দেশের খাদ্য সংকট মোকাবেলায় মোট নারী শ্রম শক্তির ৭১.৫ শতাংশ নারী কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকলেও আর্থ সামাজিক অবস্থানের তুলনায় নারী দারিদ্রসীমার প্রায় ৪৩ শতাংশ নিচে বসবাস করে। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান ২০ শতাংশ। তবে নারীরা যে গৃহস্থালি কাজ করে তার আনুমানিক মূল্য আড়াই লাখ কোটি টাকা। সে হিসেবে জিডিপিতে নারীর অবদান দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশে। জাতীয় উৎপাদনে নারীর অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে ২৫-৪০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে যদি নারীর অবমূল্যায়িত কাজের অংশ জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করা হয়। (সূত্র- মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন)
গ্রামীণ নারীদের এমন সংকটজনক অবস্থাকে ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা সম্মেলন এবং জাতিসংঘ খাদ্য সম্মেলনে প্রথম তুলে ধরা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিং এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং ১৫ অক্টোবরকে বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহিত হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে জেনেভা ভিত্তিক ওয়ার্ল্ড উইমেন সামিট ফাইন্ডেশন দিবসটি পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী পালন করে। জাতিসংঘ ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের সভায় ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র এ দিবসটি পালন করে আসছে।