কৃষিতে আস্থাশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে

যেকোনো পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। আবাদযোগ্য এক ইঞ্চি জায়গাও যাতে অনাবাদী না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি উৎপাদনে তিনি সবধরনের সহযোগিতা প্রদানের জন্য আশ্বাস প্রদান করেছেন। একই বৈঠকে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন ধান উঠবে। তখন পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিস্থিতি খারাপ হলেও কৃষি যদি ঠিক থাকে, আমরা খেয়ে চলতে পারব। অর্থাৎ সামনে যে অর্থনৈতিক দুর্যোগের আভাস অনুমান করা হচ্ছে তা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে কৃষিকেই প্রধান সমাধানসূত্র মনে করছেন সরকারের দায়িত্বশীলরা। কৃষি খাত হলো বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থার মৌলিক এবং চিরায়ত একটি জায়গা। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে খাদ্য হলো প্রধান চাহিদা। খাদ্য চাহিদা মিটানো গেলে অপরাপর চাহিদাগুলোকে কোনো না কোনোভাবে সমন্বয়ের মধ্যে আনা যায়। বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার অনেক কৃষিজ পণ্য এখন বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের রূচির পরিকল্পিত পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশজ পণ্যের পরিবর্তে আমদানিকৃত পণ্যের উপর নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছে। কিছু জায়গায় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনার ঘাটতি এবং অবহেলার কারণে বিদেশ নির্ভরতা বেড়েছে। ভোজ্যতেল ও চিনি এর অন্যতম। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা শুনালেও প্রচুর চাল আমদানি করতে হয় আমাদের। আমদানি করতে হয় গম। পেঁয়াজ ও মশলার বড় অংশ এখনও বিদেশ নির্ভর। এরকম অবস্থায় দেশীয় চাহিদা পূরণের জন্য দেশের কৃষিতে বহুমুখী উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
কৃষি উৎপাদনে কাক্সিক্ষত সফলতা না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। উৎপাদনকারী কৃষকরা উৎপাদন মৌসুমে সস্তা দরে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। মধ্যসত্ত্বভোগী অনুৎপাদনশীল প্রভাবশালী বেনিয়া গোষ্ঠী চাতুরতার সাথে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিনিয়ত কৃষকদের ঠকিয়ে থাকে। সস্তা দরে কেনা এই পণ্যই পরে তারা বাজারে অনেক বেশি দামে কিনতে বাধ্য করে ভোক্তাদের। বাজারের এই চরম শোষণবাদী চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর আকাক্সক্ষা সোনার হরিণের মতোই অধরা থেকে যাবে। সরকার এবার আমন মৌসুমে ধান ও চালের যে দাম নির্ধারণ করেছেন তা ক্রমবর্ধিত উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। সরকারের বেঁধে দেয়া এই দামকে সামনে এনে ওই বাজার নিয়ন্ত্রক মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা উৎপাদন মৌসুমে ধানের দাম আরও কমিয়ে দিবে। তাৎক্ষণিক অর্থ চাহিদা মিটানোর জন্য প্রান্তিক কৃষকরা কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হবেন। লোকসান কিংবা উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষকরা কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন। এই অবস্থার অবসানকল্পে সরকারকে সর্বাগ্রে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকরা যাতে পণ্যের যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত ন্যায্যমূল্য পান সেটি সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণাদির দাম কমিয়ে কৃষকদের নিকট সুলভ করতে হবে। কৃষি খাতে ভর্তুকী দেয়া বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পন্থা। আমাদেরও তা অনুসরণ করতে হবে। তবেই না বাড়বে কৃষি উৎপাদন। সংকট মোচনের অব্যর্থ ঔষধ এই কৃষি ব্যবস্থাকে কৃষক বান্ধব জায়গায় পুনস্থাপিত করা হলো এই সময়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই আসুন কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে যা যা করা দরকার আমরা তা সঠিকভাবে করি এবং উৎপাদন বাড়ানোর সহায়ক একটি পরিবেশ তৈরি করি। আমরা বিশ্বাস করি একটি আস্থাশীল পরিবেশ তৈরি করা গেলে কৃষিজ কোনো পণ্যের জন্যই আর আমাদের বিদেশ নির্ভর হয়ে থাকতে হবে না। আমাদের সংগ্রামী কৃষকরাই তার ব্যবস্থা করবেন।