কৃষির সঙ্কট মোকাবেলায় বাজেট বরাদ্দ অপর্যাপ্ত

সু.খবর ডেস্ক
২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটে কৃষির জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দকে কৃষি ও কৃষকের বর্তমান সংকট মোকাবেলায় অপর্যাপ্ত বলে অভিহিত করে হতাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের ১২টি কৃষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা কৃষি ও কৃষকের বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটের কথা তুলে ধরে সেগুলো সমাধানে, খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা মাথায় রেখে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের দাবি জানান।
‘৪৬ শতাংশ শ্রমশক্তির জন্য বাজেটের ২.৯৯ শতাংশ বরাদ্দ অপ্রতুল: কৃষকের সাম্প্রতিক সংকট মোকাবেলায় বাজেটে কার্যকর বরাদ্দ আবশ্যক’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করে উপকূলীয় কৃষক সংস্থা, বাংলাদেশ মৎস্য শ্রমিক জোট, বাংলাদেশ কৃষি ফার্ম শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় কিষাণী শ্রমিক সংস্থা, বাংলাদেশ আদিবাসী সমিতি, হাওর কৃষক ও মৎস্যশ্রমিক জোট, লেবার রিসোর্স সেন্টার, নলছিড়া পানি উন্নয়ন সমিতি, দিঘন সিআইজি, কেন্দ্রীয় কৃষক মৈত্রী, বাংলাদেশ ফার্মার্স ফোরাম ও কোস্ট ট্রাস্ট।
কোস্ট ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক মোস্তফা কামাল আকন্দের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকদের পক্ষ থেকে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফার্মার্স ফোরামের সমন্বয়কারী মজিবুল হক মনির। এতে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষি ফার্ম শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন, উপকূলীয় কৃষক সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মো. শহাবুদ্দিন, গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার প্রধান শামসুজ্জামান খোকন এবং ইক্যুইটিবিডি’র সৈয়দ আমিনুল হক।
বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জজানালিস্ট ফোরাম(বিসিজেএফ) এর সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন বলেন, কৃষিকে অবহেলা করে দেশের উন্নতি হতে পারে না। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের তো দেশ কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক দূর চলে গেছে। বাজেটে কৃষিকে অবহেলা করা হয়েছে বলেই আমরা মনে করি। সম্পূরক বাজেটে কৃষির জন্য বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে, বিশেষ করে কৃষি পণ্যের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ সরকার নিবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, ভূমি ব্যবহার নীতি মালা প্রণয়ন করে অবিলম্বে ভূমির অপব্যবহার রোধ করা, কৃষি পণ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবসারের ব্যবহার বৃদ্ধি, হাওর, বাওর, পুকুর, বিল-খাল, নদী খননে বাজেট বরাদ্দের আহবান জানান তিনি।
মজিবুল হক মনির বলেন, বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সময় কৃষিকে আসলে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের তুলনায় ২০১৮-১৯ এর বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ, অথচ কৃষির জন্য বরাদ্দ কমেছে ০.৪১ শতাংশ! কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ২.৯৯ শতাংশ, বর্তমান অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল ৩.৪০ শতাংশ, কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে করা হয় ২.৭৮ শতাংশ। সুতরাং এই ২.৯৯ শতাংশ-ও যে শেষে কমে যাবে সেটা বলাই বাহুল্য। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বার্ষিক কর্মসূচির মাত্র ১.১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বর্তমান অর্থ বছরের জন্য বরাদ্দ ১.২ শতাংশ রাখা হলেও, সংশোধিত বাজেটে তা করা হয় ১.০ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে কৃষি জমি হ্রাস, খাধ্য ঘাটতি বেড়ে চলা, দ্রুত নগরায়নের কারণে কৃষি জমি অকৃষি খাতে ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার বারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের পথে তীব্র চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে যাচ্ছে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য বাজেটে দূরদর্শী বরাদ্দ ও উদ্যোগ প্রয়োজন।
আব্দুল মজিদ বলেন, চাল আমদানির উপর শুল্ক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৮ শতাংশ করা হয়েছে। এটা করা উচিৎ ছিল আরও অনেক আগে, যখন কৃষকের কাছে ধান বা চাল ছিল। এখন প্রায় কোন কৃষকের কাছেই ধান বা চাল নেই, তারা অনেক আগেই সেগুলো বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে এর সুফল পেতে পারে মধ্যস্বত্বভোগীরা। চাল আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে ইতিমধ্যেই তারা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই উদ্যোগ তাই কৃষকের জন্য বরং আরও ক্ষতি করে ফেললো।
সৈয়দ আমিনুল হক বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে খাদ্য শস্যের চাহিদা ৩০ শতাংশ বেড়ে যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু খাদ্য শস্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছর ধরে শতকরা ১-এরও নিচে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধি ০.৫৯ শতাংশ, বর্তমান অর্থ বছরে এই হার ০.৯৮ শতাংশ। খাদ্য শস্যের উৎপাদন বাড়াতে না পারলে খাদ্যে সার্বভৌমত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটে পড়বে দেশ। খাদ্য শস্য উৎপাদনে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে জরুরি কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বাজেটে খুব কার্যকর কোন দিক নির্দেশনা নেই।