কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নিয়ে কেন এই অবহেলা?

সুনামগঞ্জের ঐতিহাসিক শহিদ মিনার ঘিরে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ ও কয়েক বছর ধরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা জনতার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এর সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্য বর্ধিতকরণের কাজ শুরু না করার বিষয়টি কেবল দুঃখজনকই নয় বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিরোধী কর্মকা- রূপেই বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের নেতৃবৃন্দের ভূমিকাও আমাদেরকে আশাহত করে চলেছে। তাঁরা কেন সুনামগঞ্জের প্রথম শহিদ মিনার, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয় অর্জনের আগেই বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরা শ্রম দিয়ে তৈরি করেছিলেন, যে শহিদ মিনারে প্রথম বিজয় দিবস অর্থাৎ ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর বীর শহিদানদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়েছিল; সেটির উন্নয়নে মনোযোগী হচ্ছেন না? সুনামগঞ্জ শহরে এখন সবকিছু নিয়ে গ্রুপিং কিংবা মতবিরোধের এক অন্ধ সংস্কৃতি গ্রাস করেছে। নেতৃবৃন্দের সকল অংশ কোনো কমন ইস্যুতেও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এই বিরোধের কারণেই সুনামগঞ্জ জেলা সদরের প্রত্যাশিত অনেক উন্নয়ন থমকে আছে। শহিদ মিনারের এই অবস্থার জন্যও এই অনৈক্যকেই দায়ী করছেন অনেকে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রগতিশীল মহল বারবার প্রশাসনের কাছে ঐতিহাসিক শহিদ মিনারটি সংস্কার ও বর্ধিতকরণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। শহিদ মিনার সম্প্রসারণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের কিছু জায়গা বন্দোবস্তের প্রয়োজন ছিল। এই জায়গার ব্যবস্থা করতে প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো অগ্রগতি দেখা মিলেনি। বরং সম্প্রসারণের পরিবর্তে শহিদ মিনারটিকে বাণিজ্যিক আবর্জনা দিয়ে ঢেকে ফেলার সুনিপুণ আয়োজন হতে দেখছি আমরা। শহিদ মিনারের পূর্ব দিকে অবৈধ মার্কেট গড়ে তোলা হচ্ছিল। এটি দেখে বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করে তীব্র প্রতিবাদ জানান। প্রশাসন অবশ্য মুক্তিযোদ্ধাদের আবেগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলোÑ শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে সকলের চোখের সামনে শহিদ মিনারের সৌন্দর্য নষ্ট করে কারা এমন অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সাহস দেখায়? কে এদের মদদদাতা? এই প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসেÑ এই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের রক্ষণাবেক্ষণকারী আসলে কে? মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ নাকি জেলা প্রশাসন? যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এর সত্যিকার রক্ষণাবেক্ষণকারী থেকে থাকে তাহলে এই শহিদ মিনারের সামনে এবং লাগোয়া এত এত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কী করে দিনের পর দিন ধরে চালু থাকতে পারে?
প্রশাসন, জেলা পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে সমন্বিতভাবে জরুরি ভিত্তিতে শহিদ মিনারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠান পালন করবে সেটি নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমান পরিসরে এই শহিদ মিনারের সৌন্দর্য ও পবিত্রতা নষ্টকারী উপাদানসমূহ অবিলম্বে অপসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে। শহিদ মিনারটি যাতে সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয় সেজন্য উদ্যোগ নিতে হবে। এই ব্যবস্থাগুলো করতে তেমন সময়ের প্রয়োজন নেই। আমরা আশা করব আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহিদ দিবসের আগেই এটি করা সম্ভব হবে। এরপর শহিদ মিনার সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্য বর্ধিতকরণের কাজে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
শহিদ মিনার মূলত জাতির ঐক্য, চেতনা ও গৌরবের প্রতীক। এটি মানুষের আবেগের সাথে জড়িত। সুনামগঞ্জের শহিদ মিনারটি এ কারণে অনন্য যে, সম্ভবত বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা নির্মিত প্রথম ও একমাত্র শহিদ মিনার এটি। এই শহিদ মিনার পুরো জেলার মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে। যেকোনো ইতিহাস-ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সংরক্ষণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। এই নিরিখে স্থানীয় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনকে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা আহ্বান জানাই।