কেন এই ভর্তিযুদ্ধ?

এইচএসসি পাস করা সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকরা এখন এক বড় যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছেন। এই যুদ্ধের নাম ভর্তি যুদ্ধ। অভিভাবকদের সকলেই চান তার সন্তান বুয়েট, মেডিক্যাল, কৃষি বা কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাক। হন্যে হয়ে সন্তানসমেত ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা সারা দেশ। আজ শাহজালালে পরীক্ষা তো রাতেও ট্রেনে-বাসে চড়ে রওয়ানা চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম শেষ হতে না হতেই গলদঘর্ম হয়ে কেউ ছুটছেন গোপালগঞ্জে, কেউ কুষ্টিয়ায় বা অন্য স্থানে। মোটামুটি মাস দেড়েক চলে এই ভর্তি যুদ্ধ। এই যুদ্ধ করতে পকেট থেকে খসে পড়ে লাখ খানেক টাকা। আর যারা কন্যা সন্তানের অভিভাবক তাদের খরচটা সংগত কারণেই আরও বেশি। কিন্তু এত যুদ্ধ সামলিয়েও বেশির ভাগেরই মন বিষাদগ্রস্ত থাকে পরাজয়ের কারণে। এইসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিট সংখ্যার চাইতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত পাঁচ গুণ বেশি। তাই বেশির ভাগই সুযোগ পায় না। এরা পরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ¯œাতক বা অনার্স কোর্সে ভর্তি হয়। কিন্তু ভর্তি যুদ্ধের বিফলতা এই শিক্ষার্থীদের মনোজগতে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে দিয়ে যায় সেটি এরা বিস্মৃত হতে পারে না কখনও। এই ঢাক পেটানো ভর্তিযুদ্ধে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মন ভাঙলেও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তি পরীক্ষার সাথে জড়িত শিক্ষক কর্মকর্তাদের মন এই মৌসুমে থাকে ভীষণ ফুরফুরে। শুধু ভর্তি পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে এই পক্ষ বাড়তি কিছু রোজগার করে নেন এবং বলাবাহুল্য টাকার পরিমাণটা নেহায়েৎ হালকা নয়। বলা হয়ে থাকে, ভর্তি বাণিজ্যের এই রমরমা সুবিধা প্রাপ্তির ইচ্ছা ত্যাগ করতে না পারার কারণেই আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষাকে এখনও সময়োপযোগী, আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েও সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি কার্যকর করতে পারছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এইচএসসি উত্তীর্ণ লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে একটি ব্যয়সাধ্য ভর্তি যুদ্ধে নামিয়ে দেয়ার এই অবস্থা আমাদের শিক্ষা দর্শনের অন্যতম একটি মন্দ দিক।
প্রথমত এইচএসসি উত্তীর্ণ (অল্প যে সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় জিপিএ লাভ করতে পারে না, তাদের কথা মাথায় রেখেই) সকলকেই কেন বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিক্যাল-বুয়েটে ভর্তি হতে হবে? উচ্চ শিক্ষার কোন্ পর্যায়ে কোন্ কোন্ শিক্ষার্থী পৌঁছতে পারবে তার দিক-নির্দেশনা কই? সবকিছুই কেন শিক্ষার্থী ও অুিভভাবকদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে? একজন শিক্ষার্থী যখন ১২ বছর শিক্ষাকাল শেষে এইচএসসি পাস করে তখন তার একটি যোগ্যতা গড়ে উঠে। সেই যোগ্যতা পরিমাপের মাপকাঠিই হল পরীক্ষা। কিন্তু আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা পরিমাপ করা সম্ভব হয় না। হয় না বলেই দেখা যায়, জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের একটি বড় অংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাসনম্বর অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। যদি আমাদের শিক্ষা-নীতিতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও দ্বাদশ শ্রেণির পর শিক্ষার্থীদের অভিগম্যতা সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্দেশনা থাকত তাহলে এইচএসসি পাসের পর শিক্ষার্থীদের এই কষ্ট ও ব্যয়সাধ্য ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হত না।
একটি স্বাধীন দেশ, যে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধ শতক অতিক্রম করতে চলেছে আর এক বছর পরই, সেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকবে এটি অচিন্তনীয়। মূলত দেশের স্থায়িত্বশীল ও মর্যাদাপূর্ণ উন্নয়ন নির্ভর করে শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর উপর। শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি শিক্ষা দর্শন তথা শিক্ষা-নীতি থাকা আবশ্যক। এই জায়গায় কাজ করাটা এখন অনেক বেশি জরুরি। দেশের ভাবী প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর আবশ্যকীয় কর্তব্যও বটে।