কোটায় কুঠারাঘাত নয়

মাহবুবুল হাছান শাহীন
অনেক মত ও পথের ভিন্নতার পরে অবশেষে প্রধামন্ত্রীর ঘোষণায় সরকারি চাকুরীর কোটাপ্রথা বাতিল হয়ে গেল। এখনও গেজেট হয়নি। পরিপূর্ণ গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর জানা যাবে কিভাবে কোটা ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে বিসর্জন দেয়া হলো। নানা পক্ষের নানা মতের পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু আমার মনে হয়েছে এই আন্দোলন কোন ভাবেই কোটা বাতিলের আন্দোলন ছিল না। ছিল কোটা সংস্কারের। সবচেয়ে বেশী যা ছিল মুক্তিযোদ্ধার নাতি নাতনিদের কোটা যা মূল চাকুরীর ৩০%। সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধিতা যাতে না হয় তার জন্যই কোটা সংস্কারের এই আন্দোলন। যারা নীতি নির্ধারক তারা মূল সংস্কার বুঝলেও তা নিয়ে মুখ খোলার মতো অবস্থানে কেউ যেতে পারেননি। মাননীয় প্রধনমন্ত্রী কোটা সংস্কারের কমিটি করে এবং নিজের মতামত দিলে আন্দোলন এবং কোটা সংস্কার দুটো ঠিকভাবে হতো। আমাদের লেখনি হয়তো তেমন শক্তিশালী কিছু নয়, তবুও এ অবস্থান থেকে বেশ কিছু মেধাবী তরুণ-তরুণীর সাথে আলাপ হয়। তাদের সবারই মত কোটা সংস্কারই জরুরি ছিল। আমার মতে বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে কোটা ব্যবস্থা অবশ্যই জরুরি। প্রয়োজনীয় সংস্কার হলে আন্দোলন এমনভাবে দানা বাধতো না।
জেলা কোটা রয়েছে ১০%। সারাদেশের মেধাবি তরুণ-তরুণীদের এক কাতারে আনতে গেলে অবশ্যই জেলা কোটা প্রয়োজন। তাতে অনগ্রসর জেলাগুলো থেকে শীর্ষ পর্যায়ে মেধাবিদের সঙ্গে একই কাতারে সামিল হওয়ার পথ সুগম হতো। হয়তো জেলা কোটা ১০% এর জায়গায় ৫% করা যেতে পারে।
নারী কোটা রয়েছে ১০%। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নারী কোটা অবশ্যই প্রয়োজন। অনেক মেধাবি তরুণীরা তাদের সংসারের জন্য অনেক ভালো ভালো চাকুরী ছেড়ে দেয়। দুই জন মেধাবী নারীর সাথে আলাপ করে বুঝতে পারি তারাও আন্দোলনের মতো নারী কোটা বিসর্জন চান না। মেধাবি নারীদের শীর্ষ পর্যায়ে যুক্ত হওয়ার জন্য এই কোটা জরুরি।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কোটা রয়েছে ৫%। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে এমনিতেই প্রতিকূলতার মাঝে জীবন যুদ্ধ চালাতে হয়। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তরুণ-তরুণীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটায় ভর্তি হয়ে উচ্চ শিক্ষায় তাদের মেধার সাক্ষর রাখতে সক্ষম হচ্ছেন এবং সরকারের এই কোটা ব্যবস্থায় তারা সরকারের নীতি নির্ধারণী বিভিন্ন ফোরামে জায়গা করে নিচ্ছেন। এই কোটা বন্ধ হলে তাদেরও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আসীন হওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।
প্রতিবন্দ্বী কোটা ১%। সমাজের অবহেলিত প্রতিবন্দ্বীরা ১% কোটা সুবিধা পাওয়ায় সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ সম্ভব হয়েছিল। অন্য কোনভাবে তাদেরকে চাকুরীতে জায়গা দিলেও মেধাবি প্রতিবন্দ্বীরা বিসিএস ছাড়া অন্য কোন ভাবেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না। তার জন্য প্রতিবন্দ্বী কোটা জরুরি এবং একজনকে দেখে অন্য প্রতিবন্দ্বীরাও উৎসাহিত হবে। মুক্তিযোদ্ধা নাতি নাতনি কোটা ১০ % থাকা উচিত এবং এতে যদি কোটা পূরণ নাও হয় তবে খালি রাখা উচিত। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। শুধু করুণার দৃষ্টিতে নয় মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের দেশের প্রতি মমত্ববোধ অন্য যে কারো চেয়ে বেশী বলেই আমি মনে করি। কোটা ভিত্তিতে তাদের সেই জায়গায় রাখতে হবে।
গত কিছুদিন ধরেই বিশিষ্টজন অনেকেই কোটা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন। তাদের অনেক লেখা দৃষ্টি গোচর হয়েছে। তাদের কিছু লেখার সারসংক্ষেপ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলোÑ
১৪ এপ্রিল শনিবারের প্রথম আলোতে কামাল আহমেদ এর লেখা ‘কোটা সংস্কারের যুবকম্প ঘিরে কিছু প্রশ্ন’ এর মূল সারাংশ -‘কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে তিনদিনের টানা উত্তেজনার পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী কোন কোটা রাখার প্রয়োজন নেই বলে যে মন্তব্য করেছেন, তার আলোকে সরকারি আদেশ কি জারি হয়, তা জানার জন্য আমাদের হয়তো আরো কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে’।
১৭ এপ্রিল মঙ্গলবারের প্রথম আলোতে সৈয়দ আবুল মকসুদ এর লেখা ‘কোটাবিরোধী আন্দোলনের গোড়া যেখানে’ এর মূল সারাংশ -‘এখনকার যুবসমাজই ১০-১২ বছর পরে দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাদের মনস্তত্ত্ব নীতিনির্ধারকদের পাঠ করতে হবে। সরকারের সক্ষমতাও সীমিত। ভাবাবেগ প্রসূত দাবি দাওয়া তার জন্য আন্দোলনের যেমন মূল্য নেই, তেমনি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তও কল্যাণ বয়ে আনে না। দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে সব পক্ষকেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
১৭ এপ্রিল বুধবারের প্রথম আলোতে আনু মোহাম্মদ এর লেখা ‘সরকারি দলের কোটা বাতিল করুন’ এর মূল সারাংশ ‘কোটা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এখনও পরিস্কার হয়নি, গেজেট হলে হবে। কোটা বাতিল নয়, সংস্কারই তরুণদের দাবি। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অলিখিত ‘সরকারি দলের কোটা’ বাতিল করা বা দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের উৎস দূর করা’।
২০ এপ্রিল শুক্রবারের প্রথম আলোতে আনিসুল হক এর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও কোটা সংস্কার’ এর মূল সারাংশ- ‘আমাদের পরামর্শ হলো কোটা বিলোপ নয়, কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করুন। উপজাতীয় কোটা, প্রতিবন্দ্বী কোটা, নারী কোটাও থাকতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটাও সহনীয় পর্যায়ে থাকতে পারে। এ বিষয়টা যাঁরা ভালো বুঝেন, সেই বিশেষঞ্জদের পরামর্শ নিশ্চয়ই নেওয়া হবে’।
পড়লাম, মত-পথ-মতভেদ যত পার্থক্যই থাক, সব থাকার পরও আমার মতে বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে কোটা অবশ্যই জরুরি এবং সেই সঙ্গে প্রকৃত মেধাবিদের যাতে অন্য কোন কারণে চাকুরি পেতে বিড়ম্বনার মাঝে না পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
কোটা একেবারেই বাতিল করে কোটার উপর কুঠারাঘাত ঠিক হবে না। কোটা একেবারে বিলুপ হলে শক্তিশালী আঞ্চলিক গ্রুপ সৃষ্টি হবে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অনেক জেলার প্রতিনিধি আমরা নাও পেতে পারি, তাতে সে জেলাগুলো বঞ্চনার শিকার হবে। তাদের ঘুরে দাঁড়ানো কষ্টকর হবে। সকলের সুচিন্তিত মতামত তরুণ ও মেধাবিদের অগ্রযাত্রার পথ মসৃন করবে এই প্রত্যাশায়।
লেখক : আইনজীবী