কোটা ব্যবস্থা বাতিল নয়, কোটা বিতরণ পদ্ধতির সংস্কার চাই

মনোরঞ্জন তালুকদার
লিখার শুরুতেই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি সুনামগঞ্জের খবরের সম্পাদক মহোদয়কে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সম্পাদকীয় লিখার জন্য। এই আন্দোলনের শুরু থেকেই এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে শংকিত ছিলাম। তাই আমি আমার ক্ষুদ্র সামর্থ অনুযায়ী এই আন্দোলনের অপ্রাসঙ্গিকতা ও অযৌক্তিকতাকে তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে নানা জায়গায় আমার বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুভার্গ্যবশত একটি অনলাইন পত্রিকা ছাড়া আর কোথাও তা প্রকাশ করতে পারিনি। তা নিয়ে আমার কোন দুঃখ নেই। কারণ এদেশের প্রায় সব গণমাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমই তখন কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেয়। যাঁরা কোটা ব্যবস্থা বাতিল বা সংস্কারের পক্ষে লেখালেখি করেছেন বা টিভি টকশোতে বক্তব্য রেখেছেন তাদের বক্তব্যের মূল কথা ছিল-
ক। ৫৬% কোটা পৃথিবীর কোথাও নেই
খ। কোটা ব্যবস্থার ফলে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে এবং মেধাহীনরা চাকুরী পাচ্ছে।
গ। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা কতটূকূ?
ঘ। মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০% কোটা ও নাতি নাতনীদের কোটার কি যৌক্তিকতা?
ঊপরে উল্লেখিত তিনটি অভিযোগই অসত্য বিভ্রান্তিকর এবং অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যারা এ সমস্ত কথা বলেছেন তারা জ্ঞানী গুণী মানুষ। তারা যে সঠিক তথ্যগুলো জানেন না তা বিশ্বাস করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। তবুও তারা অসত্য তথ্য দিয়ে কেন বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেন তা বোধগম্য নয়।
ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের কোটা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিটা রাজ্যে কোটা ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে। ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কোটা মিলে কোটার হার ৯০% শতাংশের উপর। ভারতে যারা কোটা ব্যবস্থায় সুবিধা পায়:-
১। সিডিউল কাষ্ট ২। সিডিউল ট্রাইব ৩। নারী ৪। ননরেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান। ৫। এংলো ইন্ডিয়ান ৬। পলিটিক্যাল সাফারার ৭। মাইগ্রেন্ট ফ্রম জম্মু এন্ড কাশ্মীর ৮। মাইনরিটি কমিউনিটি ৯। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরিবারের সদস্য।
অনুরূপভাবে পাকিস্তানেও কোটা ৯০%। তাদের কোটা গুলো প্রদেশ ভিত্তিক। সবচে হতাশার বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে যাঁরা কোটা সুবিধায় চাকুরী পেয়েছিলেন তাঁরাও আজ কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করছেন।
দ্বিতীয়তঃ কোটা ব্যবস্থায় মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তাও ডাহা মিথ্যে তথ্য। বাংলাদেশে পঁচাত্তর পরর্বতী যতগুলো নিয়োগ পি এস সি এর মাধ্যমে হয়েছে সেখানে গড়ে ৬৭% থেকে ৭২% নিয়োগ সব সময়ই মেধার ভিত্তিতে হয়েছে। আগ্রহী পাঠকরা পি এস সি এর বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো পড়ে দেখতে পারেন। তাছাড়া যারা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত হন তারাও
কিন্তু প্রিলিমিনারী, লিখিত এবং ভাইবা পরিক্ষা পাশ করার পরই কোটায় নিয়োগ লাভ করেন। কিন্তু প্রচারণাটা এমন ছিল যে মনে হচ্ছিল তারা কোন পরীক্ষা না দিয়েই কোটায় চাকুরি পেয়ে যাচ্ছিলেন।
তৃতীয়তঃ ভারত আমাদের আগে স্বাধীন হলেও তারা যদি এখনো কোটা ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে পারে তবে আমাদের দেশের কি এতই সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে কোটা ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে?
কানাডা, আমেরিকা আজও তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামীদের নানা রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোটার সুযোগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। যেখানে উন্নত বিশ্বেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কোটা ব্যবস্থা বিদ্যমান সেখানে আমাদের দেশে কোটা ব্যবস্থা তুলে দেয়া কতটা যৌক্তিক?
কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতাকারীদের সবচে বড় অভিযোগ ছিল কোটা ব্যবস্থায় প্রশাসনে কম মেধাবীরা চাকুরী পাচ্ছে। কিন্তু আমরা কখনো বিবেচনা করিনি মেধাই চাকুরী পাওয়ার একমাত্র শর্ত হতে পারে না। মেধার সাথে মনের বিকাশ না হলে সে মেধাবী দেশের কোন কাজেই আসে না। প্রমাণ তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে সি এস পি বাঙালি অফিসারদের কত শতাংশ অংশগ্রহণ করেছিলেন? কিন্তু এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষগুলো হয়ত সিএসপি অফিসারদের মত মেধাবী ছিলেন না কিন্তু হৃদয়বান ছিলেন। তাই দেশের প্রয়োজনে নিজের বর্তমান আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য বির্সজন দিয়েছিলেন।
তাই বলা যায় শুধু মেধাবী প্রশাসন দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। মেধার সাথে মননের সমন্বয় না হলে দেশের উন্নয়ন অসম্ভব। একজন মেধাবী লোক যদি দেশপ্রেমিক না হয় তবে দেশের জন্য কোন হিতকর কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই দেশ গড়ার জন্য যেমন মেধাবী লোকের প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের। একাত্তরে এই দেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিল কিছু স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করবে বলে। তাঁদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন এই দেশের দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের দায়। যেদিন এই সমাজে তাঁদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে সেদিনই আমাদের দায়মুক্তি ঘটবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রবাহমান রাখার জন্যই মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রয়োজন। অনেক আলোচককেই বলতে শুনেছি, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা কোটার যৌক্তিকতা তারা খুঁজে পান না। কেউ কেউ তো মুক্তিযোদ্ধা কোটা কে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপঢৌকন মনে করেন। তাদের একবার কি মনে পড়ে না এই স্বাধীন বাংলায় কি দুঃসময় মুক্তিযোদ্ধাদের পেরিয়ে আসতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধাপরাধীকে স্যালুট করতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সে কোথাও সম্মান পেতনা, কোন সুযোগ সুবিধা পেত না, প্রার্থীর অভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের পদগুলো অন্যদের দিয়ে পূরণ করা হত। সমাজে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান সন্ততির হয়ত এই কোটা সুবিধার প্রয়োজন নেই কিন্তু তাদের কি একবারও মনে পড়ে না বীরশ্রেষ্ঠের যে সন্তান আজ অন্যের দোকানে চাকুরী করে তার সন্তান অর্থাৎ বীরশ্রেষ্ঠের নাতি- নাতনির হয়ত এই কোটাটার প্রয়োজন।
এই আন্দোলন যতটা স্বার্থতাড়িত ততটা যুক্তি নির্ভর নয় বলেই আমার মনে হচ্ছে। না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রীরা রাত ১২টায় হলের গেট ভেঙে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে তারা কি এটা জানে না যে , ১০% কোটা তাদের জন্য সংরক্ষিত আছে? এটা জানার পরও কেন তারা এমনটি করলো? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা খুবই জরুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা কি বাংলাদেশের অনগ্রসর নারী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে? তা যদি না হয় তবে কেন তাদের দাবিতে নারী কোটা বাতিল হবে?
জেলা কোটা বাতিল করায় সবচে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাওরাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ছাত্র/ ছাত্রীরা। দেশে গড় উচ্চ শিক্ষিতের হার যেখানে ৩.৪% সেখানে সিলেট বিভাগে উচ্চ শিক্ষিতের হার হচ্ছে মাত্র ১.৭%। অন্যান্য বিভাগে সেই হার ৪.৪% থেকে ২.৫% পর্যন্ত। উচ্চ মাধ্যমিকে জাতীয় হার হচ্ছে ১২.৭%। সেখানে সিলেট বিভাগে হচ্ছে ৯.৮%। অন্যান্য বিভাগে সেই হার হচ্ছে ১৪.৫% থেকে ১১.৬%। আর মাধ্যমিকের হার হচ্ছে জাতীয় ভাবে ২২% সিলেটে মাত্র ১৯%। অন্যান্য বিভাগে সেই হার ২৪.৯% থেকে ২০.৭%। শিক্ষার তিনটি স্তরেই সিলেট বিভাগ সবার পিছনে। তার উপরেই আছে রংপুর বিভাগ। জেলা ও নারী কোটা উঠে গেলে এঈ দুই অঞ্চলের মানুষ সরকারি চাকুরী পাওয়া থেকে ব্যাপক ভাবে বঞ্চিত হবে।
পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই , কোটা ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। সংস্কার করতে হবে কোটা বিতরণ পদ্ধতিতে। সুনামগঞ্জের কোন ছেলে মেয়েকে যদি কোটা পেতে হয় তবে তাকে সুনামগঞ্জের ভিতরই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করতে হবে। ঢাকার নামী দামী প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে কেউ যেন এই কোটা ব্যবস্থার সুফল ভোগ করতে না পারে। অন্যদিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি নাতনীরা যেন এই কোটা সুবিধা না পায়। প্রকৃত পক্ষেই সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশের জন্য কোটার সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারী চাকুরীতে কমরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে কোন জেলার কত শতাংশ কর্মচারী আছে সেটা যাচাইয়ের পর সেই হারে জেলা কোটা কমানো বাড়ানো প্রয়োজন।
পরিশেষে বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়তে, দেশের সমস্ত অঞ্চলে উন্নয়নের সমতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখার কোন বিকল্প নেই। কোটা ব্যবস্থার ব্যাপক কোন সংস্কার মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক চেতনাকেই ভুলুন্ঠিত করবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ।