কোন নতুনই স্বয়ম্ভূ নয়

আদি বোরোর জন্য হাপিত্যেশ করে লাভ নেই। মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, টিকিয়ে রাখার জন্য যে অন্তহীন সংগ্রাম করে যাচ্ছে, উচ্চ ফলনশীল ধানের বীজ উদ্ভাবন তারই ফসল। যদি উচ্চ ফলনশীল ধানের উদ্ভাবন না ঘটত তাহলে ক্রমবর্ধনশীল জনসংখ্যার এই দেশটির খাদ্য চাহিদা মিটানোর পথটি কী হত? একাত্তরে মাত্র সাত কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান দিতে সক্ষম ছিল না এই দেশের কৃষি জমি। আজ জনসংখ্যা বিশ কোটি ছুঁই ছুঁই করছে, কৃষি জমির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে, তারপরও দেশে কোন খাদ্য ঘাটতি নেই। এর মূলে তো উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ তথা চাষাবাদে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারই নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। সুতরাং মানুষের প্রয়োজনে পুরাতন জিনিস বাতিল হবে নতুন জিনিস জাঁকিয়ে বসবেই। প্রকৃতির এই চিরন্তন নিয়মকে প্রত্যক্ষ করেই তো কবি সাহিত্যিকরা বরাবরই নতুনের জয়গানে মুখরিত থেকেছেন। তবে যে কোন পরিবর্তন অবশ্যই পুরোনো ঐতিহ্যের পিঠে চড়েই আসে আমাদের দুয়ারে। কোন নতুনই স্বয়ম্ভূ বা একেবারেই শিকড়বিহীন হতে পারে না। যদি এমন হয় তবে সেটি প্রকৃতি কিংবা মানুষ কারোরই বান্ধব হতে পারে না।
মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ হল খাদ্য। খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমেই মানুষ নিজের শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে আজ-তক খাদ্যের জন্য মানুষের অবিরাম লড়াইয়ের কোন শেষ নেই। মানুষ অন্য প্রাণী ভক্ষণ করে এবং প্রাণীকুল তদ্রুপ নিজের প্রজাতির বাইরে অন্য প্রজাতিকে খাদ্য বানিয়ে অভিযোজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রাণী জগতের সংখ্যাসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু মানুষ নামক প্রাণীটি আরও কারও খাদ্যবস্তুতে পরিণত হতে দেয়নি। তার মানসিক উৎকর্ষতা তাকে এই অভিনবত্ব দান করেছে। সুতরাং পৃথিবীতে অন্য প্রাণীর সংখ্যার মধ্যে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি কিংবা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেও মানুষের বেড়ে চলার এই মিছিল আটকানো যায়নি। দ্রুত বর্ধনশীল মানুষের জন্য খাদ্যের সংস্থানও তাই প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে দিতে হচ্ছে। এই জায়গায় সৃজনশীল মানুষই উদ্ভাবন করে নেয় নিজের অন্ন সংস্থানের উন্নততর প্রক্রিয়াটি। আগে যে জমিতে বছরে মাত্র ৫ থেকে ৭ মণ ধান উৎপাদিত হত সেখানে আজ সমপরিমাণ জমিতে বছরে তিনবার চাষ করে চল্লিশ মণ ধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই অগ্রগতিকে বাদ দিয়ে পুরাতনকে আঁকড়ে ধরার অর্থ হল, নিজের মৃত্যু ঘণ্টা নিজের হাত দিয়েই বাজানোর নামান্তর।
তবে ওই যে বলা হল, পুরাতন ঐতিহ্যকে স্বীকার করতে হবে। আমাদের দেশীয় আদি ধানের জাতগুলোকে বৈজ্ঞানিক পন্থায় কীভাবে আরও উন্নত করা যায় সে নিয়ে কৃষি বিজ্ঞানীরা কাজ করতে পারেন। বিজ্ঞানের বদৌলতে এখন ধানগাছের জিন রহস্য উদ্ঘাটিত। বিজ্ঞানের এই দানকে কাজে লাগিয়ে আগের ধানের স্বাদ অক্ষুণœ রেখে এর ফলন দেয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার উপায় উদ্ভাবনের মধ্যেই রয়েছে সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করার সুযোগ। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত প্রধান সংবাদ প্রতিবেদনেও কৃষি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই আকাক্সক্ষাই ব্যক্ত করেছেন।
তবে কৃষি ব্যবস্থায় পরনির্ভরতা সাংঘাতিক বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে একসময়। বিশেষ করে বীজের জন্য বিদেশ নির্ভরতাকে অবশ্যই শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। নতুবা আমরা আন্তর্জাতিক শক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে পড়তে পারি। এই ধরনের আশঙ্কাকে মাথায় রেখে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের কাজ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।