কৌশলে ধান দিচ্ছে মধ্যসত্ত্বভোগীরা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেও ঢিমেতালে চলছে এর কার্যক্রম। তবে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দাবি কৃষকদের তালিকা তৈরি না হওয়া, বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিলম্ব হচ্ছে।
জানা যায়, জেলায় এবার মাত্র ৬ হাজার মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৩ মে ধান সংগ্রহের সরকারি পত্র পাওয়ার পর শনিবার পর্যন্ত মাত্র ১০-১২ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করতে পেরেছে জেলা খাদ্য বিভাগ। তবে গতকাল রবিবার সদর উপজেলার মল্লিকপুর গোাদমে প্রায় হাজার খানেক ধানের বস্তা দেখা গেছে।
এদিকে কৃষি কার্ডধারী প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে বোরো ধান কেনার কথা থাকলেও কৃষকদের নামে কৌশলে সদর উপজেলার মল্লিকপুর খাদ্য গোদামে ধান দিচ্ছেন মধ্যসত্ত্বভোগীরা।
খাদ্য গোদমের বাহিরে টানানো নির্দেশনা অনুযায়ী ‘প্রকৃত কৃষক ব্যতিত কোন মধ্যসত্ত্বভোগী/ফরিয়া ধান সরবরাহের উদ্দেশ্যে গোদাম চত্ত্বরে প্রবেশ নিষেধ। প্রবেশ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এমন সাইনবোর্ড থাকলেও অনেক মধ্যস্বত্ত্বভোগীকেই গুদাম চত্ত্বর এমনকি গোদামের ভেতরেও দেখা গেছে।
গতকাল রোববার বিকালে সরেজমিনে সদর উপজেলা মল্লিকপুরে খাদ্য গোদামে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে। খাদ্য গোদামের ভেতরে ও বাহিরে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। সদর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ১ হাজার মে.টন ধান সদর উপজেলার খাদ্য গোদামে সংগ্রহ করা হবে।
খাদ্য গোদামের আশপাশের স্থানীয় একাধিক লোকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গোদামে ধান বিক্রিতে মধ্যসত্ত্বভোগীরা সুকৌশলে কৃষকদের নামেই সবকিছু করছেন। কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ড ক্রয় করে এমনকি তাদেরকে উপস্থিত রেখে কাজটি করছেন তারা। খাদ্য গোদাম সংশ্লিষ্টদেরও হাত রয়েছে এসব কাজে। না হলে এত মানুষ গোদামের ভেতরে কি করে থাকতে পারে।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলার এল. এস. ডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়ার সাথে কথা বলতে খাদ্য গোদাম এলাকায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায় নি। দায়িত্বরত সহকারি উপ খাদ্য পরিদর্শক জানান, ওসি এলএসডি স্যার অফিসে আছেন। পরে অফিসে গিয়েও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাকে পাওয়া যায়নি। অফিসে থাকা একজন নারী কর্মচারী জানান, ওসি এলএসডি স্যার গোদামে আছেন। ওসি এলএসডি শাহীন মিয়ার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কথা বলতে চাইলে একবার বন্ধ, আরেকবার খোলা এই অবস্থায় কয়েকবার পাওয়া যায়। তবে ফোন রিসিভ করেননি তিনি।
মল্লিকপুর খাদ্য গোদামের সহকারি খাদ্য উপ পরিদর্শন সুব্রত তালুকদার বলেন,‘ মধ্যসত্ত্বভোগীরা ধান দিচ্ছেন এটা সঠিক নয়। যাদের কৃষি কার্ড রয়েছে, আমরা কেবল তাদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করছি। ‘আগে আসলে, আগে পাবেন’ এই নীতিতেই আমরা ধান সংগ্রহ করছি। প্রকৃত কৃষকরা নিজেরা সরাসরি এসে গোদামে ধান দিচ্ছেন। মাঝ পথে কারোর কোন সুবিধা নেয়া বা দেয়ার প্রশ্নই আসে না।’ রবিবার অন্তত এক হাজার মণ ধান গোদামে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহ ২০১৮-এর আওতায় সুনামগঞ্জ জেলার ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৬ হাজার মেট্রিক টন। জেলার ১১ উপজেলার মধ্যে সদর উপজেলায় ৫০০ মেট্রিক টন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ৫০০ মেট্রিক টন, দোয়ারাবাজারে ৪০০ মেট্রিক টন, ছাতকে ৪০০ মেট্রিক টন, জগন্নাথপুরে ৬০০ মেট্রিক টন, দিরাইয়ে ৭০০ মেট্রিক টন, শাল্লায় ৭০০ মেট্রিক টন, ধর্মপাশায় ৮০০ মেট্রিক টন, জামালগঞ্জে ৬০০ মেট্রিক টন, তাহিরপুরে ৫০০ মেট্রিক টন ও বিশ্বম্ভরপুরে ৩০০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করবে সরকার।
তবে ধান ক্রয়ের পরিমাণ খুবই কম বলে দাবি করছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা। এমননি জেলা প্রশাসক ধান সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছেন। তবে ধান ক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির কোন নির্দেশনা এখনও পায়নি জেলা প্রশাসন ও জেলা খাদ্য বিভাগ।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের গাজীনগর গ্রামের কৃষক মনির মিয়া বলেন,‘ আরো আগে ধান কেনা শুরু হলে অনেক ভাল হত। গত বছর প্রত্যেক কৃষকের ৩ টন করে ধান দেয়ার সুযোগ ছিল। এইবার একজন কৃষক ১ টন করে দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।’ ধান সংগ্রহের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করার দাবি জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সারা জেলায় কৃষি কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৯ হাজার। চলতি বোরো মওসুমে জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করেছেন প্রান্তিক, ছোট, বড় ও মাঝারি শ্রেণির ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪২ জন কৃষক। চলতি বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে, যার বাজারমূল্য তিন হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু জেলার প্রত্যেক কৃষকের কাছ থেকে ১ মে. টন করে ৬ হাজার কৃষকের কাছ থেকে মাত্র ৬ হাজার মে.টন ধান কেনা হবে। ৩ লাখ ৪৩ হাজার কৃষকই সরকারি খাদ্য গোদামে ধান বিক্রর সুবিধা বঞ্চিত হবেন।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামনা রঞ্জন দাস বলেন,‘ আমরা দুই মে.টন ক্রয় করে উদ্বোধন করেছিলাম। এখন প্রতিটি ইউনিয়নের তালিকা তৈরি হচ্ছে। হাওর এলাকায় নৌকায় পরিবহন ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছু দেরী হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই পুরোদমে শুরু করা হবে। তবে আমাদের চাল ক্রয়ের কার্যক্রম অনেক এগিয়েছে।’
ধর্মপাশা উপজেলা এল.এস.ডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রানেশ লাল বিশ্বাস বলেন,‘ আমরা ১ মে. টন ক্রয় করে উদ্বোধন করেছি। বৃষ্টি-বাদলসহ নানা করণে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া আমাদের গোদামে সরকারি ত্রাণের চাল রয়েছে। ত্রাণের চাল শেষ হলে ঈদের পরপরই আমরা ধান সংগ্রহ শুরু করব।’
দিরাই উপজেলা খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আ. সামাদ বলেন,‘ গতকাল রোববার মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয় ধান ক্রয়ের উদ্বোধন করেছেন। আজ থেকে ধান সংগ্রহ শুরু হবে। প্রতিটি এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। আমরা আশা করছি মাস দেড় মাসেই সব ধান কিনতে পারব।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জাকারিয়া মুস্তফা বলেন, ‘গত ১৪ মে ধান ক্রয়ের নির্দেশনার চিঠি পেয়েছি। কিন্তু বৃষ্টি ও আবহাওয়া খারাপ থাকায় কিছু বিলম্ব হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তবে চলতি সপ্তাহেই পুরোদমে ধান ক্রয় শুরু হবে। আমরা প্রকৃত কৃষষদের কাছ থেকেই ধান ক্রয় করব। শুধুমাত্র কৃষকরাই যাতে গুদামে ধান দিতে পারেন সে ব্যাপারে খাদ্য বিভাগ সতর্ক থাকবে। ’