ক্রাইস্টচার্চ সন্ত্রাস, সম্প্রীতি বজায়ে নিউজিল্যান্ড সরকারের অনুপম ভূমিকা

একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় নিউজিল্যান্ড সরকারের ভূমিকা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। নিউজিল্যান্ড পৃথিবীর অন্যতম শান্তির দেশ হিসাবে খ্যাত। এই দেশে অপরাধ প্রায় হয় না বললেই চলে। এরকম অবস্থায় নিরাপত্তা নিয়ে তাদের তেমন কোন পূর্বপ্রস্তুতিও ছিল না। ব্রেন্টন ট্যারেন্ট নামের অস্ট্রেলীয় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী উগ্র সন্ত্রাসীটি নিজের চরম বিদ্বেষ মিটাতে তাই এই শান্তির দেশটিই বেছে নিয়েছিল যার ফলশ্রুতিতে ১৫ মার্চ শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে হামলা চালিয়ে সে নিরপরাধ ৫০ মুসলমানকে হত্যা করে। নিউজিল্যান্ডের জন্য এই হামলা জাতীয় লজ্জার বলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরদার্ন। তিনি দেশবাসীকে আস্বস্ত করেছিলেন নিউজিল্যান্ড কোন বিশেষ ধর্মীয় কিংবা বর্ণগত পরিচয়ের দেশ নয়। এটি সকলের। মসজিদে নৃশংস হামলার ফলে যাতে এই ধরনের ঘৃণা ও প্রতিশোধপরায়ণতার কোন প্রবৃত্তি জাগ্রত না হয় সেজন্য তিনি বিশেষ করে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের আবেগকে সম্মান জানিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এর সর্বশেষ পর্যায়ে গত শুক্রবার হামলার শিকার ক্রইস্টচার্চের আলনূর মসজিদে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির জাতীয় রেডিও ও টেলিভিশনে জুমার নামাজের আজান ও ইমাম গামাল ফৌদা প্রদত্ত খুতবা সম্প্রচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী সে দেশের জনগণকে নিয়ে নামাজের আগে মসজিদের সামনে অবস্থান নিয়ে দুই মিনিট নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। এদিন প্রধানমন্ত্রী কালো জামা ও হিজাব পরিধান করেছিলেন। সেখানে থাকা নারী পুলিশ সদস্যরাও কালো হিজাব পরে আসেন। এই সবই ছিল দুঃখে ভারাক্রান্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মনে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। তাঁদেরকে আশ্বস্থ করা যে একটি হামলা নিউজিল্যান্ডের সম্প্রীতি ও শান্তি বিনাশকারী হতে পারে না। নিজ দেশের আক্রান্ত একটি জনগোষ্ঠীর মনের ভীতি দূর করে আস্থা স্থাপনে নিউজিল্যান্ড সরকারের এইসব ভূমিকা তাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। দাঙ্গা ও সন্ত্রাস পীড়িত দেশে দেশে ঘৃণার পরিবর্তে ভালবাসা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের এই দৃষ্টান্ত কাজে দিবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ আজকের পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সমস্যা। মানব সভ্যতা আজ এই সন্ত্রাসবাদের চরম হুমকি মাথায় নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই ধরনের সংকট পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। যদিও এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক সা¤্রাজ্যবাদী ও পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের প্রশ্নটিই জড়িত। কিন্তু ওইসব শক্তিকে আজ অনুধাবন করতে হবে পৃথিবী যদি মানুষেরই বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায় তাহলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব করে তারা কোথায় বিজয় পতাকা উড়াবে? মানুষের মৃত্যুপুরীতে? ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা, বিদ্বেষের পরিবর্তে বিদ্বেষের যে বিষ সর্বত্র ঢেলে দেয়া হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের দৃষ্টান্ত সেখানে আশার সম্ভাবনা জাগিয়েছে।
নিউজিল্যান্ড বহু জাতি-গোষ্ঠী অধ্যূষিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। জাতি গোষ্ঠীর মূল অংশটি ইউরোপিয়ান যারা মোট জনসংখ্যার ৭৮%। এছাড়া ১৫% মাউরি, ৯% এশিয়ান ও ৭% প্যাসেফিক অঞ্চলের মানুষ বসবাস করেন প্রশান্ত মহাসাগর বেষ্টিত এই দেশটিতে। ৫০ লাখেরও কম দেশটির জনসংখ্যা। প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করেন ২০ জনেরও কম মানুষ। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছেন যাদের সংখ্যা শতকরা ১০ ভাগেরও কম। বরং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের চাইতে ধর্মে বিশ্বাস করেন না এমন মানুষের সংখ্যা দেশটিতে বেশি। এমন বৈচিত্রময়, সম্পদশালী ও সম্ভাবনাময় একটি দেশ সন্ত্রাসপীড়িত হয়ে থাকলে তা হবে মানব সভ্যতার আরেক কলঙ্ক।
আসুন, নিউজিল্যান্ড সরকারের সম্প্রীতি জোড়দারকারী ভূমিকাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে আমরা যে যার মত করে ভূমিকা রাখি।