কয়লার মূল্য বৃদ্ধিতে বিপাকে ইটভাটার মালিকেরা

বিশেষ প্রতিনিধি
কয়লার অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে এবার বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের ইটভাটার মালিকেরা। অনেক ইটভাটা বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। কয়লার দাম না কমলে আগামী মৌসুমে ইটের দাম বেড়ে যাবে। হাওরাঞ্চলে সরকারি বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয় বেড়ে যাবে। ইটভাটার মালিকরা মনে করছেন, সুনামগঞ্জ-সিলেট সীমান্তের শুল্কস্টেশন দিয়ে ভারতীয় কয়লা আমদানী শুরু হলে দেশে কয়লার মূল্য সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ভারতের মেঘালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন ডিমাহাসাও জেলা ছাত্র ইউনিয়নের আবেদনের ভিত্তিতে ২০১৪ ইংরেজির ১৭ এপ্রিল ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইব্যুনাল মেঘালয় সরকারের অবৈধ কয়লা খনন ও পরিবহন বন্ধের নির্দেশ দেন। একই বছরের ৬ মে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় মুখ্যসচিব এ ব্যাপারে প্রতিটি জেলায় নির্দেশ জারি করেন। এই নির্দেশে গ্রীন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয় মেঘালয়ের জেলা প্রশাসকদের। এ কারণে ২০১৪ ইংরেজির ১৩ মে থেকে মেঘালয়ের সীমান্ত জেলাগুলোয় ১৪৪ ধারা জারি করে কয়লা পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শুল্কবন্দর সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বড়ছড়া- চারাগাঁও ও বাগলী এবং সিলেটের শুল্ক স্টেশন দিয়ে কয়লা আমদানী বন্ধ হয়ে যায়।
রপ্তানীকারকরা আইনী লড়াই করে প্রথমে উত্তোলিত কয়লার রাজস্ব জমা দিয়ে ২ মাস রপ্তানীর সুযোগ পান। এই সময়ের মধ্যে কেবল উত্তোলিত কয়লা রপ্তানী করেছেন মেঘালয়ের রপ্তানীকারকরা। কিন্তু মাইনিং করতে পারেন নি। এরপর থেকে গত প্রায় ছয় বছর বছরে এক- দুই মাস কয়লা আমদানী হয়েছে। বছরের বেশিরভাগ সময় আমদানী বন্ধ থাকায় আমদানী কারকরা রয়েছেন বেকায়দায়। লাখো শ্রমিকের দুর্বিসহ জীবন কাটছে।
অন্যদিকে, হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোর ইটভাটাগুলোও জ¦ালানী সমস্যায় পড়েছে। এবার জ¦ালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়া, চীন ও আফ্রিকার কয়লার বাজার দর বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় মহাসংকটে পড়েছেন ইটভাটার মালিকরা।
সুনামগঞ্জ জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাজিব রায় বললেন, গেল বছর কয়লা কিনেছি প্রতি টন ১০-১২ হাজার টাকায়। প্রতিটি ইটের বিক্রয় মূল্য ছিল ১০ টাকা। এবার ইন্দোনেশিয়া, চীন ও আফ্রিকার কয়লার বাজার মূল্য পরিবহন খরচসহ প্রতি টন ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এতো দামে কয়লা কিনে ইট পুড়ালে প্রতিটি ইটের বিক্রয় মূল্য ১৫ টাকা পড়বে। তাতে ইট বিক্রয় করতে সমস্যা হবে। সরকারি- বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। তার মতে, কয়লার বাজারে সি-িকেট তৈরি হয়েছে, এটি ভাঙতে হলে ভারতীয় কয়লা আমাদানী করতে হবে। ভারতের মেঘালয়ের কয়লার মানও ভালো। এই কয়লার পরিবহন খরচও কম। এই সময়ে কয়লা প্রাপ্তি সহজলভ্য না হলে ইট পুড়ানো সম্ভব হবে না।
দিরাইয়ের শরিফ ব্রিক ফিল্ডের মালিক সাদিকুর রহমান চৌধুরী বললেন, ইট বানানো শুরু হয়েছে। কিন্তু ইট পুড়াতে পারবো কি না জানি না। কয়লার কারণে ব্রিক ফিল্ড এবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বড়ছড়া-চারাগাঁওয়ের বিশিষ্ট কয়লা আমদানী কারক মো. ইউনুস আলী বললেন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বড়ছড়া, চারাগাঁও, বাগলী এবং সিলেটের তামাবিল-সুতারকান্দি শুল্কস্টেশন থেকে ভারতের মেঘালয়ের কয়লা উত্তোলনের মাইনসগুলোর দুরত্ব ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের মধ্যে। জ¦ালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও দুরত্ব কম থাকায় এখানে পরিবহন খরচ খুব বেশি বাড়ে না। মেঘালয়ের কয়লার মানও ভালো। এই কয়লা আমদানী হলে প্রতি টন কয়লার পরিবহন খরচসহ দেশের যে কোন প্রান্তে ১৫-১৬ হাজার টাকায় পৌঁছানো সম্ভব। এখন ইট পুড়ানোর সময় অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে ভারতীয় কয়লা আমদানীর বিষয়ে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বড়ছড়া-চারাগাঁও আমদানীকারক সমিতির সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার বললেন, মেঘালয়ের কয়লা রপ্তানী কারক সমিতির সভাপতি জুলিও সিজার ডিঙ্গার শুক্রবার জানিয়েছেন, মেঘালয় থেকে কয়লা রপ্তানী করতে এখন আর আইনি কোন বাধা নেই। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই কয়লা রপ্তানী শুরু করার চিন্তা রয়েছে তাদের। আলকাছ উদ্দিন খন্দকার বললেন, দেশে কয়লার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ভারতীয় কয়লা আমদানীর কোন বিকল্প নেই।
সিলেট কয়লা আমদানী কারক সমিতির সভাপতি চন্দন কুমার সাহা বলেন, বৃহস্পতিবার ভারতের করিমগঞ্জ কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বলেছি, আমাদের আগের এলসি’র কয়লা পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য। তিনি জানান, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেখানকার কোল ইন্ডিয়া প্রা. লি. কে উত্তোলিত কয়লা নিলাম করে চালান ইস্যু করার দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চালান ইস্যু করার জন্য যে শর্ত দিয়েছিলেন, মেঘালয়ের প্রত্যন্ত এলাকায় সেগুলো পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানালেন, আজ রোববার বড়ছড়া, চারাগাঁও, তামাবিল সমিতির আমদানী কারকরা কয়লার মূল্য নির্ধারণসহ নানা বিষয়ে আলোচনার জন্য বৈঠকে বসবো। ওখানে নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। তার মতে এই সময়ে ভারতীয় কয়লা আমদানী না হলে কয়লার অস্বাভাবিক মূল্য কমার কোন ব্যবস্থা নেই। এই বিষয়টি মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উর্ধ্বতন অনেকের কাছেও মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।