কয়েকটি প্রকল্প এখনও ঝুঁকির মুখে

আলী আহমদ, জগন্নাথপুর
হাওরের ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধের নির্ধারিত কাজের সময় ১০ দিন অতিবাহিত হলেও জগন্নাথপুরে রবিবার পর্যন্ত বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। এদিকে হাওর পরিদর্শনে দেখা গেছে, জগন্নাথপুরের সর্ববৃহৎ নলুয়া হাওরের কয়েকটি প্রকল্প এখনও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কাজ হয়েছে দায়সারা। বাঁধের পাশ থেকে মাটি উত্তোলন করে বাঁধের ওপর মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরী করা হয়। প্রকল্পেরই পাশে রয়েছে খালের মতো পুরোনো বিশাল একটি গর্ত। হঠাৎ করেই প্রশাসনিক তদারকিও কমে গেছে। হাওরে দেখা মিলেনি পাউবোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের। হাওরের কৃষকরা জানিয়েছেন, নলুয়া হাওরের প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ফসলের আবাদ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নলুয়া হাওরের ফসল সারা বাংলাদেশের একদিনের খাবার যোগাদ নিতে পারে।
নলুয়া হাওর সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাওরজুড়ে সবুজের সমারোহ। আর কয়েকদিন পর কৃষকের কর্ষ্টাজিত ফসল ঘরে তোলার সম্ভাবনার হাতছানি দিলেও কৃষকের দু:শ্চিতার যেন শেষ নেই মাঠভরা ফসল নিয়ে। এই দু:শ্চিতার কারণ এখনও হাওরের কয়েকটি ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধে ঝুঁকি রয়েছে। এসব প্রকল্প ফসলের মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত শনিবার বিকেলে সরেজমিন পরির্দশকালে দেখা যায়, নলুয়া হাওরের পোল্ডার ১ এর আওতাধীন ১ নম্বর প্রকল্পের তেলিবাঁধা নামক স্থানে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তোলে বাঁধে কাজ করা হয়েছে। এই প্রকল্পটি ঘেষে আছে পুরোনো খালের বিশাল একটি গর্ত। আর গর্তের পাশেই কামারখারী নদী। প্রকল্পটির ০.৯৪৮ কিলোমিটার সংস্কার/মেরামতের জন্য ৬ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এ প্রকল্পটি ভয়ঙ্কর ঝুঁকি হয়ে আছে হাওরের জন্য। সামান্য পানির চাপেই বাঁধ ভেঙে হাওর ডুবির শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া এই প্রকল্পের কিছু অংশে কাজ হয়েছে দারসারাভাবে।
১ নম্বর প্রকল্পের পাশেই ২ নম্বর প্রকল্প রয়েছে। ২ নম্বর প্রকল্পে দুই নম্বরেই কাজ দেখা দেখা গেছে। প্রকল্পের ১.৫৯ কিলোমিটার মেরামতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। প্রকল্পে সামান্য মাটি দায়সারাভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। দাসনাগাঁও থেকে হরিনাকান্দি সামন পর্যন্ত ৫শত’ ফুট এলাকায় জুড়ে বাঁধে মাটি পড়েনি। তবে ৩, ৪, ৫,৬, ৭. ৮ নম্বর প্রকল্পের মাটির কাজ ভালো হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ৮ নম্বর প্রকল্পের হালেয়া নামকস্থানে গর্ত থাকায় প্রকল্পটি মারাত্মক ঝুঁকি হতে পারে। এই প্রকল্পটি ২০১৭ সালে ভেঙে নলুয়া হাওরের ফসলডুবির ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া ১১ ও ১২ নম্বর প্রকল্পের মাটির কাজ এখনও শেষ হয়নি।
১ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি এখলাছুর রহমান তালুকদার বলেন, বাঁধের পাশ থেকে মাটি তোলা হয়নি। বাঁধের ঝুঁকি কমাতে বাঁধের পাশেই আরেকটি বিকল্প বাঁধ দিয়েছি। নীতিমালা অনুয়ায়ী বাঁধের কাজ হয়েছে।
২ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি আল আমিন বলেন, এক দুইদিনের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হবে। কাজ চলমান রয়েছে।
৮ নং প্রকল্পের সভাপতি আবুল কয়েছ জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাঁধ ও মাটির বস্তা ফেলে সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার বলেছি। এখানে কাজ না হলে হাওরের ফসল ঝুঁকির মুখে পড়বে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন কমিটির জগন্নাথপুরের আহবায়ক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এখনও ঝুঁকির মধ্যে আছে হাওরের ফসল। এরকারণ ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধের কাজ এখন শতভাগ শেষ হয়নি।
জগন্নাথপুর উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারি প্রকৌশলী হাসান গাজী জানান, ৮৫ ভাগ প্রকল্পের কাজ শেষে হয়েছে। অবশিষ্ট প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পগুলো গুরুত্বসহকারে আমরা দেখছি। তিনি জানান, এবার জগন্নাথপুরে ৪৬টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে হাওরের ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধের কাজ হচ্ছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুল আলম মাসুম জানান, গুরুত্ব দিয়েই হাওরের বেড়িবাঁধের কাজগুলো দেখছি। যেসব প্রকল্পে ক্রুটি রয়েছে দ্রুত এগুলোর কাজ শেষ করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাঁধের কাজে কোন ধরনের গাফিলতি আমরা বদরাশত করা হবে না।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শওকত ওসমান মজুমদার বলেন, এবার জগন্নাথপুরের প্রধান নলুয়া হাওরসহ উপজেলার সব ক’টি হাওরে ২০ হাজার ৫শত হেক্টর বোরো ফসল চাষাবাদের আওতায় আনা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে জগন্নাথপুরে বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। এখনও কাজ শেষ হয়নি।