কয়েক ঘণ্টায়ই লবণের বাজার স্বাভাবিক

স্টাফ রিপোর্টার
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকসহসহ নানাভাবে লবণের মূল্য বেড়েছে এমন মিথ্যা গুজব প্রচার হওয়ায় সোমবার রাত ৮ টা থেকে ১০ টা’র মধ্যে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় সব দোকানের লবণ কিনে নেন ক্রেতারা। গভীর রাত পর্যন্ত শহর এবং শহরতলীর বিভিন্ন মোদীর দোকানে লবণ কিনতে ভিড় জমান ক্রেতারা। কোনো কোনো দোকানে আসা ক্রেতা এবং দোকানী’র মধ্যে লবণ কিনতে গিয়ে বাকবিত-াও হয়। লবণের মূল্য অনেক বেড়ে গেছে, এই গুজব গ্রামাঞ্চলে কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ৩৫ টাকা কেজি’র লবণ এক’শ টাকার উপরেও বিক্রি করেছেন কোন কোন দোকানী।
খবর পেয়ে রাতেই ও মঙ্গলবার সকালে শহরের বিভিন্ন স্থানের দোকানী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কথা বলায় এবং শহরে মাইক বের করে লবণ নিয়ে গুজবে কান না দেবার জন্য প্রচারণা চালানোয় স্বস্তি ফিরে সাধারণের মাঝে। ফেইসবুকে প্রচারিত গুজবকে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট’এর কারসাজি দাবী করে ক্রেতারা- ফেইসবুকে যারা গুজব ছড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। ক্রেতারা বলেন, ৩৫ টাকা কেজি’র লবণ কেউ কেউ ১০০ টাকার উপরে বিক্রি করেছে।
শহরের শহীদ আবুল হোসেন রোডের দোকানী ইউসুফ আহমদ বলেন, আমার দোকানে ২ বস্তা লবণ ছিল, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মহল্লার কয়েকজন মহিলা এসে ৪ কেজি, ৫ কেজি করে নিয়ে গেছেন। আমরা আগের দামেই বিক্রি করেছি। আরও লবণ থাকলেও বিক্রি করা যেতো। তিনি জানান, রাতে মোল্লা সল্টের সুনামগঞ্জের ডিলারের পক্ষ থেকে ম্যানেজার আবু বকর ফোন করে জানান, লবণের মূল্য বাড়েনি। কেউ চাইলে আগের দামেই বিক্রি করার জন্য বলে দেন তিনি।
শহরের ষোলঘর এলাকার তিতাস মিয়া বলেন, সোমবার রাত ১০ টায় এক মহিলা একটি দোকানে এসে লবণ চাইলে, দোকানী বলেন, এক কেজি লবণ আছে ১০০ টাকা দিতে হবে। পরে ১০ টাকা কমে ৯০ টাকায় এক কেজি লবণ কিনে নেন এই মহিলা।
আরপিননগরের তজম্মুল আলী বলেন,‘লবণ নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক অ্যাকশন না হলে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিত অসৎ ব্যবসায়ীরা।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি সহিদুর রহমান বলেন,‘লবণের মূল্য নিয়ে গুজব ছড়ানোয় অনেকে পরিবারে ব্যবহারের জন্য বেশি পরিমাণে লবণ কিনেছেন । রাতেই ব্যবসায়ীদের ডেকে এনে বলে দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা সঠিক মূল্যে লবণ বিক্রি করেন।’
জানতে চাইলে জেলা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা আব্দুল খালিক বলেন, লবণের ডিলারদের দোকানে দোকানে গিয়েছি আমরা। ডিলাররা বলেছেন, লবণের মূল্য বাড়েনি। আমরা বলেছি, মূল্য বাড়ার বিষয়টি যে গুজব, তা তারা যেন দোকানীদের জানিয়ে দেন।
মঙ্গলবার বিকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বাজার মনিটরিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ ব্যবসায়ীদের জানান, দেশে প্রায় ৬ লাখ টন লবণ মওজুদ আছে। কোথাও লবণের দাম বাড়ে নি। কেউ বেশি দামে লবণ বিক্রি করতে পারবে না।
এদিকে লবণ ঘাটতি সংক্রান্ত সংবাদে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহবান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় লবণ চাষীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সরকারের সার্বিক সহযোগিতার ফলে লবণ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে লবণ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার (১৬.৫৭ লক্ষ মে.টন) চেয়ে অধিক পরিমাণ অর্থাৎ ১৮.২৪ লক্ষ মে.টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখ পর্যন্ত দেশে লবণের মজুদ ৬.৫০ লক্ষ মে.টন যা দিয়ে দেশে কমপক্ষে ৫ (পাঁচ) মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। বর্তমানে চাহিদার চেয়ে অধিক লবণ মজুদ রয়েছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থ বছরের লবণ মৌসুমে লবণ চাষীরা ইতোমধ্যেই লবণ চাষ শুরু করেছে। তাই বর্তমানে দেশে লবণের ঘাটতি বা ভবিষ্যতে ঘাটতি সৃষ্টি সংক্রান্ত কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ নেই।
মতবিনিময়ে জেলা প্রশাসক
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেছেন, পেঁয়াজ ও লবণ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাজারে লবন নেই বা লবণে দাম বৃদ্ধির খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব। বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত লবন মজুদ রয়েছে। লবণ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে লবণ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার (১৬.৫৭ লক্ষ মে.টন) চেয়ে অধিক পরিমাণ অর্থাৎ ১৮.২৪ লক্ষ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখ পর্যন্ত দেশে লবণের মজুদ ৬.৫০ লক্ষ মেট্রিক টন যা দিয়ে দেশে কমপক্ষে ৫ মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। বর্তমানে চাহিদার চেয়ে অধিক লবণ মজুদ রয়েছে। তাছাড়া লবণ চাষীরা চলতি ২০১৯-২০ অর্থ বছরের লবণ মৌসুমে ইতোমধ্যেই লবণ চাষ শুরু করে দিয়েছেন। তাই বর্তমানে দেশে লবণের ঘাটতি বা ভবিষ্যতে ঘাটতি সৃষ্টি সংক্রান্ত কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, আমরা বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করবো। কেউ যদি প্যাকেট নির্ধারিত দামের চেয়ে অধিক দাম চায় তাহলে সাথে সাথে আমাকে বা পুলিশকে জানাতে পারবেন। আমরা ওই সকল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
পেঁয়াজের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ বলেন, পেঁয়াজের দাম কমে যাবে। এখন দাম বৃদ্ধি থাকলেও আশা করি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক মাত্রায় চলে আসবে একটু ধৈর্য্য ধরুন সব ঠিক হয়ে যাবে।
এসময় তিনি ব্যবসায়দের কড়া নির্দেশনা দিয়ে বলেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিক্রয় মূল্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। পাইকারি বাজার থেকে একদামে কিনে নিয়ে খুচরা বাজারে ২০-৩০ টাকা বাড়িয়ে দিবেন এটা মানবো না। সংকটের সময়ে বেশি মুনাফা লাভের আশা করবেন না।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক এমরান হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোকলেছুর রহমান, জেলা রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মতিউর রহমান পীর, সুনামগঞ্জ ব্যবসায়ি সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজ আহমদ, জেলা মার্কেটিং অফিসার আব্দুল খালেক প্রমুখ।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ শহরের বাজার ঘুরে প্রতিটি দোকানে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ মজুদ রয়েছে মর্মে দেখতে পান। লবণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান/কোম্পানীর পক্ষে থেকে জানানো হয়েছে লবণের সরবরাহে কোথাও কোন ঘাটতি নেই। কেউ কোনো প্রকার কারসাজি করলে জেলা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।