খসরু ভাইকে নিয়ে দুয়েক কথা

ইকবাল কাগজী
এক ॥ কম্পিউটারটির আদি মালিকের স্বপ্নসুন্দর কায়া
আজকাল কাগজেকলমে কোনও কীছু, বিশেষ করে কোনও বিস্তৃত গদ্য কিংবা কবিতা লেখা হয় না। সাধারণত কম্পিউটারেই লেখা হয়ে থাকে। অন্তত আমার জীবনে সেটাই অভ্যস্ততায় পর্যবশিত হয়ে পড়েছে। আমাকে প্রতিদিনই কোনও না কোনও কীছু লিখতেই হচ্ছে। লিখছি বলা যায় না, যথার্থ বললে বলতে হয়, অনুরোধে ঢেঁকি গলাধঃকরণ করছি অনায়াসে। অবলীলায় ঢেঁকি গিলে ফেলায় মহাভ্যস্ত লোক বোধ করি জগৎসংসারে আমার মতো আর কেউ নেই। আমার জীবনের অধিকাংশ লেখা অনুরোধের ঠেলায় পড়ে লেখা। নিজের ইচ্ছামতো লেখার যা-কীছু আছে, তা-সব-কীছুতেই, মনে হচ্ছে, দশদিকে বারণের বাড়াবাড়ি তরবারি গর্দান নেওয়ার অভিপ্রায়ে উঁচিয়ে আছে।
যখন লিখেতে বসি সে-বারণের কথা মাথায় রেখেই বসি। কিন্তু বসলেই যে-প্রসঙ্গটি আমার সবচে আগে মনের তেপান্তরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে কোনও এক পৌরাণিক নায়কের মতো এসে উপস্থিত হয়, সে-টি আর কীছুই নয়, সে-টি হলো আমার লেখারযন্ত্র কম্পিউটারটির আদি মালিকের স্বপ্নসুন্দর কায়া। সেই স্বপ্নপুরুষের মুখটি আর কারও কাছে কেমন লাগে আমার জানার কথা নয় এবং স্বাভাবিকভাবেই আমি জানি না। তবে নির্দ্বিধায় বলি, এই মুখটি আমার কাছে সুন্দর মুখগুলোর একটি। এই সুন্দর মুখটি আমি দেখি প্রতিদিন, যতো বার কম্পিউটারটিতে লিখেতে বসি ততো বার দেখি, আমার মনের নয়ন দিয়ে। মনের নয়ন যে-ব্যক্তিগত দৃষ্টিপথ দিয়ে এই মুখটি দেখে সে-দৃষ্টিপথটি বদান্যতার প্রশান্ত সুষমা দিয়ে অকীর্ণ, নিঃস্বার্থ সে-বদান্যতার গায়ে সাদরে মাখানো আছে ¯েœহের ¯িœগ্ধসুন্দর অপরূপ রেণু, যে-অপরূপের সমাহার পৃথিবীতে বিরল ও অতুলনীয়। এই পথে যে-মুখটি আমার নয়নের কোণে কুসুুমিত হয় তার একটি আলাদা রঙ আছে, সে-রঙের আলদা এক নিজস্ব আলো আছে। সে-মুখের চোখ, ঠোঁট, ভ্রু, কপোল, চিবুক প্রত্যেকটির আলাদা একটি ভঙ্গি আছে । এই ভঙ্গির নিহিতার্থটিও আলাদা, আমার জন্যে অপরূপ এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলে বলতে হয়, আমার জন্যে সীমিত অর্থে হলেও লেখার স্বাধীনতার নিশ্চয়তাকে উপটৌকন করে তোলা।
অর্থাৎ আমি যে-কম্পিউটারটিতে অজকাল লিখি, সে-টি আমাকে দিয়েছিলেন, প্রিয় খসরু ভাই, মানে এই সুনামগঞ্জের সাধারণ্যে যিনি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যখন শুনলেন আমার নিজস্ব কম্পিউটারটি অকর্মণ্য হয়ে পড়েছে, তাঁর কাছে এই অঘটনের অর্থ দাঁড়িয়েছিল কম্পিউটারের অভাবে তাঁর একজন অনুজ লেখালেখি করতে পারছে না, সে-টা সবচে বড় অঘটন, তিনি তা সহ্য করতে পারেন নি। ব্যক্তিবিশেষের লেখার স্বাধীনতাকে স্বাধীন করে দিতে সে-ব্যক্তিকে কম্পিউটারের অভাবের প্রতিবন্ধকতামুক্ত করার দায় তিনি নিজের ঘাড়ে তোল নিয়েছিলেন। তাঁর উচ্চারিত বাক্যগুলো আজ স্মৃতির চৌকাঠ মারিয়ে বিস্মরণের তেপান্তরে হারিয়ে গেছে, কেবল পড়ে রয়েছে বক্তব্যের নির্যাসটা। আর এই নির্যাসটা এই যে, আগামী কাল তাঁর বাসায় যেতে হবে। একটা কম্পিউটার তিনি আমাকে দেবেন। সেটাতে আমার কাজ চলবে, বলে তিনি মনে করেন। আসলে তিনি যা মনে করতেন, মনের ভেতরে তাঁর যে ভাবনা ছিল, সেটাই সে-দিন তিনি বাস্তবে করে দেখিয়েছিলেন এবং প্রকারান্তরে বলেছিলেন, ‘আমি বর্ণ, শব্দ, বাক্য সাজিয়ে যে-সৃষ্টিকর্ম মানুষ চালায়, সেই শিল্পকর্মকে ভালোবাসি।’