খাদ্যে ভেজাল- আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত হোক

ভেজালবিহীন কোনো পণ্য খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশে বিরল ঘটনা। ভোক্তা এখন খোঁজে কোন পণ্যে ভেজালের পরিমাণ কম! জ্যাম-জেলি, দই, মিষ্টি ও ডালডা পরীক্ষা করে শতভাগেই ভেজাল পেয়েছে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি। ভেজাল শনাক্ত হয়েছে সেমাই, সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ নমুনায়। অথচ নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা আইন রয়েছে, আছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, অভিযানও চলছে নিয়মিত বিরতিতে। তাতেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নেয়ায়। আর এর ভুক্তভোগী সাধারণ ভোক্তাশ্রেণী। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব ভেজাল খাদ্যদ্রব্য চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। তাই তারা কি শুধু নীতিজ্ঞানহীন কিছু মানুষের লোভের শিকার হতেই থাকবে? নগরবাসীর স্বাস্থ্যরক্ষা ও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পুলিশসহ অন্যান্য প্রশাসনিক সংস্থা তাদের সহযোগিতা করার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। এমনিতেই মানহীন কিংবা ভেজাল পণ্য উৎপাদকদের শাস্তি খুব একটা হয় না। এছাড়া পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর দক্ষতারও অভাব আছে। দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থাকলেও তাদের তৎপরতা সীমিত। ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান অনেকাংশে রাজধানীতেই সীমিত। ঢাকার বাইরে তৎপরতা নেই বললেই চলে।
আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কিছু অভিযান হলেও এখন তা নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় এ অভিযান নিয়মিত করতে হবে এবং আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ভেজালকারীরা যাতে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ভেজালকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের মৌলিক প্রধান চাহিদা খাদ্য। সুস্থ, সুন্দর আর স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণের জন্য মানুষ যা পরিভোগ করে, সে খাদ্য ভেজালবিহীন হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। আশার কথা হলো, আমাদের দেশে ভেজালবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। এখন দরকার তার সুষ্ঠু প্রয়োগ। এ আইনের অধীনে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নামে একটি সংস্থাও গঠন করা হয়েছে। তবে আমরা যতদূর জানি, সংস্থাটিতে মারাত্মক জনবল সংকট রয়েছে। এ সংকট দূর করে সংস্থাটিকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করা এবং খাদ্যসামগ্রী কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বেচ্ছায় যেন অভিযোগ দায়ের করতে পারে, তৈরি করতে হবে এমন পরিবেশও। একটি সমৃদ্ধিশালী জাতি হিসেবে দাঁড়াতে হলে আমাদের হতে হবে কর্মঠ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। আর তা নিশ্চিত করতে পারে কেবল খাঁটি খাবার। তাই ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আপস করা যাবে না। ভেজালের মতো আরেকটি ক্ষতিকর বিষয় হলো, খাদ্য দূষিত করা। দেশের বাজার ব্যবস্থার কারণে কিছু খাদ্যপণ্য বিশেষত মাছ-মাংস-সবজি দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এটি বন্ধ করা যায় সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় জনগণের জন্য যে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা হয়, তার মধ্যে নিরাপদ খাদ্য একটি। পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার খাবারের থালায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এ মান ঠিক রাখা হয়। আমদানি করা পণ্য যেন ভেজাল ও বিষমুক্ত থাকে, সেজন্য তার মান কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়। সংশ্লিষ্ট দেশের ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন খুবই শক্তিশালী এবং কারো মুখাপেক্ষী নয় তারা। আর বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই দুর্বল, এমনকি খাদ্যের মান ও ভেজাল পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব পর্যন্ত নেই; লোকবলের সংকট তো আছেই। আর ক্ষমতাশালী কোনো কোম্পানির প্রক্রিয়াজাত খাবার হলে তো কথাই নেই, কারো সাধ্য নেই তার বিরুদ্ধে কথা বলার। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া ও ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা প্রয়োগের কোনো নজির নেই। অথচ খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি এখন ওপেনসিক্রেট। খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের মান এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সাতটি মন্ত্রণালয় কাজ করে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখানে হযবরল অবস্থা বিরাজমান। কার কোন দায়িত্ব, কে কীভাবে পালন করবে, সেটা নিরূপণ করতেই সময় চলে যায়। আমাদের ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর আছে। দেশে ভোক্তা অধিকার আইনও আছে। কিন্তু কোথাও এ আইনের তেমন প্রয়োগ হতে দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে তাদের তৎপরতা চোখে পড়লেও তা পর্যাপ্ত নয়।