খাদ্য শষ্য সংগ্রহে অন্যায্যতা

মধ্যনগরে আয়োজিত এক মানববন্ধনে কৃষক সমিতি ও ক্ষেতমজুর সমিতির নেতৃবৃন্দ একটি চমৎকার তথ্য পরিবেশন করেছেন। চলমান ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচীর পরিসংখ্যান দিতে গিয়ে তারা বলেছেন জেলার সাড়ে তিন লাখ কৃষকের কাছ থেকে যেখানে ৬৫০৮ মে.টন ধান কেনা হচ্ছে সেখানে মাত্র দুই মিল মালিকের নিকট থেকে চাল কেনা হচ্ছে ১৩৭৬২ মে.টন যা ধানের আকারে ২০৬৪৩ মে. টন হয়ে থাকে। এই তথ্যটি দিয়ে তারা খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচীর কৃষক বিরোধী তথা মিলমালিক পোষণ ও তোষণ নীতির দিকটি উন্মোচন করতে চেয়েছেন। অংকের সরল হিসাবে সাড়ে তিন লাখ কৃষকের চাইতে তিন গুণ বেশি ধান নেয়া হচ্ছে মিলারদের নিকট থেকে। অর্থাৎ এই ২ মিলার চাল সরবরাহ করে প্রায় ১০ লাখ কৃষকের সমপরিমাণ বরাদ্দ নিয়ে নিচ্ছে। এই পরিসংখ্যানটি দেখে গল্পের সেই মাস্টার মশাইর কথা মনে পড়ে যায়। একটি কুকুরের পিছনে সারা মাসে যে ব্যয় হয় তিনি তার এক চতুর্থাংশ বেতনও পেতেন না বলে আক্ষেপ করে কুকুরের চারটি ঠ্যাং এর সমান কয়জন শিক্ষক হন সেই হিসাব মিলাতে যেয়ে হিমশিম খেয়েছিলেন। সেখানে ব্যবধান ছিল চার গুণের চাইতে সামান্য বেশি বা কম। কিন্তু উপরে যে হিসাবটি দেয়া হলো সেখানে একজন মিলারের সমান কয় লাখ কৃষক হন সেই অংক মিলাতে দিলে অতি বড় পাটিগণিত বিশারদও ফেল মেরে যেতে পারেন। সত্যিকার অর্থেই ভীষণ ব্যবধান এই দুই পক্ষের মধ্যে। এই ব্যবধানই পুঁজিবাদী তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির নির্মমতা। এই বৈসাদৃশ্য সম্মিলনের গড় হিসাবই বলে আমাদের মাথাপিছু আয় বছরে ১ হাজার ৯০৯ ডলার। অর্থাৎ কিনা ২ মিলার আর তাদের সমান সুযোগ পাওয়া ১০ লাখ কৃষক একই পাল্লায় এখানে হিসাবের মুশিক প্রসব করছে। গড়পড়তা হিসাবের ভেলকিবাজিতে পড়ে বাংলাদেশের কৃষক সমাজ আজ মেরুদ- ভেঙে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়েছেন।
ঢাকায় এক জাতীয় সম্মেলনে কিছু জাতীয় ব্যক্তিত্ব ৫০ লাখ টন ধান কিনার সুপারিশ করেছেন। বোরো ধান উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৪০ লাখ টন। কিন্তু বেকুব কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রার চাইতেও ১৩ লাখ মে.টন ধান বেশি ফলিয়ে ফেলেছেন। এই ধানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বেড়েছে। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে। বাজারে মোটামোটি স্থিতিশীল মূল্যে (কৃষকের ধানের দরের চাইতে অবশ্য দুই বা আড়াই গুণ বেশি দামে) চাল সরবরাহ করা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভীষণ সন্তুষ্ট। অন্তত খাদ্যের জন্য এখন আর কাউকে হাহাকার করতে শোনা যায় না। সারা দেশের মানুষকে শান্তির বাতাবরণে রাখতে বৃষ্টিতে ভিজে রোদে পুড়ে কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে সংগ্রামী কৃষক সমাজ খাদ্যশস্য উৎপাদনের যে রেকর্ড করলেন তার বিনিময়ে তারা কী পেলেন? মণ প্রতি ২/৩ শ’ টাকা লোকসান। কৃষকদের এই পুরষ্কার প্রাপ্য? কৃষকদের এই সর্বনাশা পুরষ্কার প্রাপ্তির বদৌলতে আমাদের অর্থনীতিতে কী কী দুর্ঘট ঘটে যেতে পারে সে নিয়ে সারা দেশে এখন আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। এই ঝড় যদিও কোন রাজনৈতিক বা কৃষক সংগঠনের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করতে পারেনি, তারপরেও এক ধরনের ঝড় যে শুরু হয়েছে তা পত্র-পত্রিকা খুললেই বেশ বুঝা যায়।
২ মিলারকে ১০ লাখ কৃষকের সমান বরাদ্দ দেয়ার প্রচ- বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অবসান ভিন্ন কৃষক সমাজকে টিকিয়ে রাখার আর কোন বিকল্প পথ নেই।