খেতা কম্বল কোনতাঔ নাই শীত কেমনে কাটাইতাম’

‘বিশেষ প্রতিনিধি
‘খেতা কম্বল বন্যায় ভাসাইয়া নিয়া গেছে, আমার বাচ্চা কাচ্ছা, শ^াশুড়ি, কারোরই কেতা-কম্বল-বালিশ কিছুই নাই, স্বামী দিনমজুর করে, অখন আমরা খাইমু, না ঘর বানাইমু, কি দিয়া কিনমু শীতের কাপড়’।
‘বন্যার পরে বালিশ ঔ আছিল না, চকির (চৌকির) উপরে একটা কাপড় বিছাইয়া ঘুমাইতাম, আমার ভাসুর বেড়াইতা আইছলা, ইঅবস্থা দেইক্কা দুইটা বালিশ কিইন্না দিছইন, দুই বালিশে আমরা চাইরজন ঘুমাই, শীতের বাতাস আইতেই চিন্তা অইতাছে, ইবারের শীত কেমনে কাটাইতাম’
বেলা এক টা বাজে অখনো বিয়াইন্না খানিঔ খাইছি না, ঘুরতাছি সময় গনতাছি (ঘুনতেছি) কোন লাখান দুপুর অইগেলে চাইরাটা খাইয়াম, রাইতের লগি চাইরাটা রাখবাম, বহুত কষ্ট কইরা লেপ কম্বল জুরাইছলাম, বন্যায় সব গেছে, অখন কাম কইরা খাইয়া দাইয়া- টেকা থাকলে না কিনতাম, কাপড় ছোপর বইল্লা-টইল্লা কয়েকদিন ধইরা ঘুমায়রাম, অখনতরি তো হিভাবে শীতঔ পড়ছে না, শীত পড়লে ইবার-কিবায় থাকমু।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের পাড়ের গ্রাম ইসলামপুরের মমতাজ বেগম, শিরিনা বেগম ও আলেয়া বেগম বুধবার দুপুরে এই প্রতিবেদকের কাছে বন্যার পরের শীত মোকাবিলার দুশ্চিন্তার কথা জানাচ্ছিলেন।
মমতাজ বেগম ও জয়নাল আবেদীনের পরিবারে জয়নাল আবেদীনই একমাত্র উপার্জনকারী। পরিবারের সদস্য ছয় জন। এখন গ্রামে কাজও নেই। একদিন কাজ পেলে তিনদিন বসে খেতে হয়। গেল বন্যায় জয়নাল আবেদীনের ঘরও ভেঙে যায়। এখনো পরিবার নিয়ে গ্রামেই শ^শুর বাড়িতে আশ্রয়ে আছেন। বন্যায় নষ্ট হওয়া লেপ-তোষক এখনো বাড়ির ভিটায় মাটির সঙ্গে মিশে আছে দেখিয়ে এই দম্পত্তি জানালেন, সামনের শীত তাদের জন্য বড় কষ্ট নিয়ে আসছে।
গ্রামের নুরুল ইসলাম সামান্য কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। তার স্ত্রী শিরিনা বেগম জানালেন, ঘরে বুক সমান পানি হলে ঢেউয়ের মধ্যেই প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের সরকারি ভবনে ওঠেছিলেন। যাবার সময় বন্যার পানিতে ভিজে নষ্ট হওয়া লেপ তোষক কম্বল ঘরের টিনের ছালের উপরে রেখে যান। একমাস পর এসে দেখতে পান সবকিছুই পঁচে গেছে। এরপর বালিশ ছাড়াই ঘুমিয়েছেন অনেকদিন। এখন দুই বালিশে চারজনকে শুতে হয়। ঘরে একটা শীতের কাপড়ও নেই।
এই গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আলেয়া বেগম জানালেন, ছয়জনের সংসার একচোখ অন্ধ এক ছেলে উপার্জনকারী। তিনবেলা খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। বহু বছর কষ্ট করে লেপ কম্বল করেছিলেন। বন্যায় সব নষ্ট হয়ে গেছে। এবারের শীত কষ্টে যাবে তাদের।
আলেয়া বেগম, শিরিনা বেগম এবং মমতাজ বেগম কেবল নয় এই গ্রামের খুর্শিদ আলম, শামছুল হক, গোলাম হোসেন, আব্দুল জব্বার, আকবর আলী, শহরবানু, জাহেদা বেগম এই প্রতিবেদককে দেখে এগিয়ে এসে বললেন, দয়া করে আমাদের নামটিও লিখে নিয়ে যান ভাই, শীতের কাপড় না পেলে এইবার রক্ষা নাই।
বয়োজ্যেষ্ঠরা জানালেন, গ্রামে তিনশ পঞ্চাশ পরিবারের বাস। এর মধ্যে অন্তত ষাট পরিবারের শীতবস্ত্রের কিছুই নেই। এরা এবার শীত কিভাবে কাটাবেন এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম জানালেন, সরকারি হিসাবে গেল ১৭ জুনের বন্যায় জেলার ১২ উপজেলায় পাঁচ হাজার তিনশ পচানব্বই পরিবারের ঘরবাড়ি লেপ-তোষক বিছানাপত্রসহ সবকিছুই ভেসে গেছে। এরমধ্যে ছাতক, দোয়ারাবাজার ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা বেশি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানালেন, বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এবার শীতের কষ্টে পড়তে পারে এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গেল সপ্তাহে ত্রাণ সচিবের কাছে অতিরিক্ত শীতবস্ত্র চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কম্বল ও সুয়েটার বেশি দেবার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। রোববারের মধ্যে মৌখিকভাবেও সংশ্লিষ্ট সকল উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে।