গল্প… অনিক

শুভ দেবনাথ

টিনসেড ঘরের কোনো এক ফাঁক দিয়ে সকালের সূর্যের আলো এসে অনিকের চোখের উপর পরে। আদো ঘুম আদো জাগরণে থাকা অনিক তখন ; শীতের সকালের আলস্যময় ঘুমকে জোর করে বিদায় দিয়ে নিজের থেতলে যাওয়া দাঁত মাজার ব্রাশটা নিয়ে পুকুরে চলে যায়। ঘাটের সিঁড়িতে উপুর হয়ে ঝুঁকে বসে বা হাতের দুই আঙুল জলে ডুবিয়ে আবার উঠিয়ে নেয়। গতকাল ছুটির দিন ছিলো। সকালে বালুর মাঠে ক্রিকেট খেলেছে সে। তারপর ক্রিকেট খেলা থেকে এসে এই পুকুরেই স্নান করেছে । অবশ্য তখন সূয্যি মামা আকাশের মাঝ বরাবর পরম ক্ষমতায় বিদ্যমান ছিলো। আজকের এই রোদ কুয়াশার যৌথ প্রয়াসের সকালে সেই পুকুরের জলই হিম শীতল হয়ে আছে। পুকুরের জল একদম ভালো না। দূষিত হতে হতে বিচিত্র রং ধরেছে! কি আর করা, ফুট চারেক গভীরতা যে পুকুরের ; সে পুুকুুর কি আর এত এত মানুষকে ব্যবহার করতে দিয়ে নিজের বুকের জল কে শুদ্ধ রাখতে পারে? সম্ভব না। দাঁত ব্রাশ করতে করতে অনিক ক্ষুুধায় চুঁ চুঁ করতে থাকা নিজের পেটের দিকে তাকায় ; রাতের খানাটা জমেনি। এদিকে সকালের নাস্তায়ও ওর কোনো অধিকার নেই। ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে দেখেছে মামাতো ভাইরা চায়ে টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে খাচ্ছে। অনিক তা পায় না। তাকে একেবারে ভাত খেতে দেওয়া হয়। সকালের সূর্য ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। সে একপলক সূর্যের দিকে চেয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলে। এটা তার অভ্যেস। প্রতিদিন একবার হলেও সোজা সূর্যের দিকে সে চাইবেই। পুকুরের চতুর্দিকে থাকা গাছের পাতায় পাতায় সূর্যের আলো লেগে চিক চিক করছে। পুকুরের পাশের গ্রামের প্রধান রাস্তায় যেখানে যেখানে সুর্যের আলো পড়েছে; সেখানেই উষ্ণতাপ্রত্যাশী বয়োবৃদ্ধ মানুষরা ভিড় করে আছেন। এদিকে অনিকের মামা নিজের প্রতিদিনের ঠাকুর পূজা শেষ করে তাকে নিয়ে খাবার টেবিলে বসলেন। অবশেষে যখন প্রত্যাশিত মোটা চালের সাদা ভাত অনিকের সামনে রাখা হয়, তখন অনিকের ইচ্ছে করে ; তরকারি ছাড়াই ভাত গুলিকে গাপুস গুপুস করে ভিতরে পাচার করে দিতে। আজ রবিবার। নিরামিষ রাঁন্না হয়েছে। অবশ্য সমস্যা নেই । মামির হাতের যেকোনো তরকারিই অনিকের কাছে অমৃত মনে হয়। শীত ঋতুতে পাতাকপির ভাজি আর ডাল অনিকের প্রিয় খাদ্য। ভাগ্যক্রমে মামি আজ তাই রেঁধেছেন! ক্ষুদার্থ অনিক প্রথম বারের ভাত দুই মিনিটেই সাভার করে মামিকে বললো- ভাত দাও। উনি দিলেন, অনিক তা দেড় মিনিটেই সাভার করে ফেললো! সে আবার বললো- মামি ভাত দাও। উনি আবার দিলেন। এবারও তা দেড় মিনিটে সাভার করে ফেলে অনিক মহাফ্যাসাদে পরে গেলো! ক্ষুধাটা এখনো রয়ে গেছে। আরেকবার ভাত দাও বলতেও লজ্জা করছে । অনিক ভাবলো এখানেও মা আর মামিতে বিস্তর তফাত, আজ মা হলে তো কোনো কথাই ছিলো না। তাছাড়া মা তো আর এতো ছোট চামচ দিয়ে ভাত দেন না। মা একবার যা ভাত দেন তা খেলেই উদর পূর্ণ হয়ে যায়। মামির এই চিমটি চিমটি ভাত দেওয়াটা ওর একদম ভালো লাগে না ; জানেন অনিক লাজুক তারপরেও তার সাথে এরকম ব্যাবহার! এটা ভাবতে ভাবতে গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়ে ক্ষুধাকে চাপা দিয়ে মামার পিছন পিছন বেরিয়ে পরে অনিক।

গ্রামটি যেনো ইট পাথরের শহরের কাছাকাছি এক টুকরো সবুজ স্বর্গ! গ্রামের ভিতর দিয়ে চলে গেছে পাঁচ বছর আগের ঢালাই করা রাস্তা। তার দুই পাশে সারি সারি বাড়ি, কোনোটা ইট পাথরের কোনোটা মাটির। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে রয়েছে সারি সারি গাছ। কোনোটা এখনই বিশাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোনোটা ক্রমেই বিশাল হচ্ছে। আর সেটাই এই গ্রামের আসল সৌন্দর্য। অনিক আরও ছোটকালে যখন মামার বাড়ি আসতো, এই রাস্তাটা তখন ইটের ছিলো। নৌকা থেকে নেমেই এক দৌঁড়ে সে উঠে যেতো সারি সারি করে বিছানো ইটের রাস্তায়, পিছনে মা বাবা আসছেন কি না তাতে তার কোনো পরোয়া থাকতো না। শ্যাওলা পড়া ইটের রাস্তাটার প্রতি তার গভীর টান ছিলো। সুদূর নিজ গ্রাম থেকে যখন  চোখ বুঝে মামার বাড়িটা কল্পনা করার চেষ্টা করতো তখনও তার চোখের সামনে যে দৃশ্যটা আগে ভাসতো তা এই ইটের রাস্তা দিয়ে নিজের দৌঁড়ে যাওয়ার চিত্র। মামার পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের সীমানা পেরিয়ে আসে অনিক। সোজা উত্তরে হাঁটছে তাঁরা। উত্তর পূর্ব হয়ে মৃদু শীতল হাওয়া বইছে , পূর্ব আকাশে সূর্য ভেসে থাকায় ; এই মৃদু হাওয়া অনিকের শরীরে অন্যরকম ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে নিজের জীর্ণশীর্ণ সোয়েটারটির কথা ভাবে অনিক। এই রোদ উজ্জ্বল সকালেও এটা গায়ে রাখতে হচ্ছে! জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে শরীরে বাতাস লাগছে। নিচে পড়া ফুলহাতা গেঞ্জির কোনো সাধ্য নাই বাতাস আটকিয়ে শরীরকে উষ্ণ রাখার। রাতে ফিরার সময় কি ঠান্ডাটাই না জেঁকে ধরবে, ভাবতেই তার গা শিউরে উঠে।

নদী পাড়ের বালু মাটিকে তাক তাক করে কেটে বানানো রাস্তা ; যাত্রী ছাউনি থেকে সোজা খেয়াঘাটে নেমে গেছে। শীত ঋতুর এই মধ্য গগনে নদীর জল প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে । নৌকায় বসে অনিক রোদ উজ্জ্বল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। শীতকালের মেঘহীন আকাশ অনিকের প্রিয় থেকে প্রিয়তর। এতক্ষণে মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখতে থাকা অনিকের মনে পড়লো তার পিঠে কেউ হাত দিয়ে কিছু বলার অপেক্ষায় আছে। মুখ ফেরাতেই দীপ বলতে শুরু করলো ; কাল যা খেললি না ভাই! দারুণ ছিলো তর টাইমিং, বল কোন জায়গায় ফেলবো ঠিক করতেই পারছিলাম না। সব কটাকেই অসাধারণ ক্ষমতায় বাউন্ডারি ছাড়া করছিলি! স্কুলযাত্রী দীপের মুখে চলছে অনিকের ক্রীড়া কীর্তির প্রশংসা, অথচ অনিকের এদিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই! তার চোখ তখন দীপের ইউনিফর্মের দিকে । দীপ এবার ক্লাস সেভেনে উঠেছে। লেখাপড়ায় থাকলে অনিকও এবার সেভেনে উঠতো। অনিক লেখাপড়ায় মোটামোটি ভালো ছিলো ; অপছন্দের সাবজেক্টে টেনেটুনে পাস করলেও পছন্দের সাবজেক্টে স্কুল সেরা রেজাল্ট বাঁধাই ছিলো। কিন্তু কি আর করার, অভাবের সংসারের ঘানি বাবার একার টানা সম্ভব হচ্ছিলো না বলে অনিককেও যুক্ত হতে হয় সেই ঘানি টানায়। নৌকা ঘাটে লাগে, অনিকরা শহরের দিকে পা বাড়ায়।

শহরের ব্যস্ততম জল্লারপার পয়েন্ট, এই পয়েন্টের পাশেই রয়েছে বিখ্যাত মদনমোহন কলেজ, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মনিপুরী দোকান, চারমুখি এই পয়েন্টের বামের ব্যাস্ততম রাস্তাটি চলে গেছে জিন্দাবাজারে। অনিক রিক্সা থেকে নেমে ওই রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে। রোদ ধীরে ধীরে চড়া হচ্ছে, কিছুটা গরম লাগা শুরু হয়েছে , অনিক গায়ের জীর্ণশীর্ণ সোয়েটার টি খুলে হাতে নিয়ে নেয়, এখানে দোকান ঘর কিছু কম, একটু বাসা বাড়ি বেশি। সময়টা স্কুল টাইমের হওয়ায় প্রায় সব বাসা থেকেই, দু একজন স্কুল ছাত্রী বেরিয়ে আসছে। জিন্দাবাজারগামী অনিক ; ওদের ইউনিফর্ম দেখেই বুঝে নিলো যে ওরা অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী। অনিক দ্রুত পা চালায়, নিজের চির আক্ষেপ, এভাবে ইউনিফর্ম পড়ে স্কুলে যাওয়ার বাসনাটাকে ভাবনায় টাই না দিয়ে দোকানে দেরি হয়ে যাওয়ার ইস্যুটাকে জোরালো ভাবে মনে মনে দাঁড় করিয়ে দ্রুত দোকানে পৌঁছানোটাকেই একমাত্র লক্ষ্য বলে ঠিক করে নেয়। শপিংমলের চলন্ত সিঁড়ি বন্ধ করা। অনিক দৌঁড়ে দৌঁড়ে সাতটি স্থির সিঁড়ি অতিক্রম করেই ব্ঝুতে পারলো আজ তার কর্মের শুরুটা ভালো হচ্ছে না। ভয়াতুর মুখের অনিক বাকি সিঁড়ি অতিক্রম করে সিঁড়ির পাশের ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে দোকানের কাছে গেলো। আগেই এসে পড়া ম্যানেজার রাজু মিয়া ফ্লোর ঝাড়ছিলেন, অনিককে দেখতে পেয়েই মুখকে অদ্ভূত ভাবে বিকৃত করে বলতে শুরু করলেন ; আরে নবাবপুত্র, তা এলেন এবার! আসুন আসুন আপনার জন্য চা পানের ব্যাবস্থা করে করেছি। অনিক রাজু মিয়ার এই টিটকারিকে পাত্তা না দিয়ে চু মেরে বালতিটা নিয়ে জলের জন্যে বাথরুমের দিকে চলে যায় , ঝাড়ুটা আজ রাজু মিয়াই দিয়ে দিয়েছেন, অনিককে শুধু এখন দোকানের ফ্লোরটা মুছতে হবে।

ঘড়িতে রাত আট টার উপরে বাজে। শহরের বিশাল বিশাল শপিংমল গুলি একে একে বন্ধ হচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় বাসা মুখি মানুষের গাড়ি ধরার তাড়া। এদিকে মাত্র চল্লিশ টাকার বিনিময়ে নিজের শৈশবের অমূল্য দশ ঘন্টা বিক্রি করে অনিকও মামার সানিধ্যের লক্ষ্যে যাত্রা করে। কোর্ট পয়েন্টের অল্প আগেই একটি সস্তা ইলেক্টিক দ্রব্যের মার্কেট। এখানে প্রচুর টেলিভিশনের দোকানও আছে। টেলিভিশনের দোকানের সামনে ক্রীড়ামোদী মানুষের ভিড়, অনিকও এই ক্রীড়ামোদীদের দলে যোগ দেয়। চলছে ওয়েস্টইন্ডিজ বনাম বাংলাদেশের টি টুয়েন্টি ম্যাচ। খেলার চরমলগ্নে বুদ হয়ে থাকা অনিকের পিঠে কেউ কিল দেওয়ায় সে রাগান্বিত চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইতেই তার মতোই একটি দোকানে চাকরী করা পিংকু বললো, তুই এখানে, এদিকে তোর মামা অপেক্ষা করছেন, চল, না হলে রেগে যাবেন। মুখ বেজার করে অনিক চললো পিংকুর পিছু পিছু। সকালে যে রাস্তা দিয়ে অনিক পরম উষ্ণতার পরশ নিয়ে হেঁটে এসেছে। রাতে সেই রাস্তায় হিম যেনো অনিকের শরীরের সবগুলো অঙ্গকে অসাড় করে দিচ্ছে। শীতের আগ্রাসী রূপ তার জীর্ণ সোয়েটারকে কোনো পাত্তা না দিয়েই তার প্রভাব বিস্তার করে চলছে। নৌকায় উঠার পর যে প্রখর শীত অনিককে জেঁকে ধরে ছিলো এতক্ষণে মামা বাড়ির উঠানে আসতেই সেই শীত তার প্রখরতা কিছুটা কমিয়েছে। শূন্য টিফিন ক্যারিয়ারটি বারান্দায় রেখে অনিক হাত পা ধুতে পুকুরে চলে যায়। কোর্ট পয়েন্টের পুরান কাপড়ের দোকান থেকে চল্লিশ টাকা দিয়ে কেনা পড়নের প্যান্টটাই অনিকের এক মাত্র ফুলপ্যান্ট। নিচটা ধূলায় একদম সাদা হয়ে গেছে। অনিক জলময় সিঁড়িতে নেমে প্যান্ট সহ পা টাকে হাঁটু পর্যন্ত ধুয়ে নেয়। জর্জেট প্যান্ট, সকালের আগে নিশ্চিত শুকিয়ে যাবে। জল সকালের থেকেও বেশি ঠান্ডা। অনিকের মনে হচ্ছে ; আটলান্টিক মহাদেশ থেকে বরফ এনে কেউ এই পুকুরে ফেলে দিছে। শীতের রাতের কুয়াশাও জমিয়ে পড়েছে। রাস্তার ল্যামপোস্টে জ্বলা বাতিটি যেনো কুয়াশার কাছে হার মেনে নিভে যাচ্ছে। অনিক কিছুক্ষণ ল্যামপোস্টের বাতির দিকে চেয়ে থাকে। আরও কিছুক্ষণ থাকতো, যদি না মামা ডেকে বলতেন ; খাবার রেডি। সকালের মতো এখনও ভাতের সাথে কপি শাক এনে দিলেন মামি। তবে নিরামিষ নয় মাছের মুন্ডু দিয়ে রাঁধা। সঙ্গে মামাও খেতে  বসেছেন। মামার থালার অর্ধেক ভাত শেষ না হতেই অনিক তার পুরোটা খেয়ে মামির ভাত দেওয়ার অপেক্ষা করলো। মামি আবার ভাত দিলেন। অনিক আবার খেয়ে শেষ করলো। এদিকে মামার থালায় কিন্তু প্রথম বারের ভাতই এখনো কিছুটা রয়ে গেছে। অনিকের পেট অর্ধেকও ভরেনি। তাই লজ্জা শরমের বালাই না করে সে আরেকবার ভাত চাইলো। মামি দিলেন। অনিক চেষ্টা করলো ভাতগুলিকে গুণে দেখতে। ঝুরঝুরে ধবধবে সাদা ভাত। অনিকের গুণতে বেশী সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু পাশে থাকা মামার আড় চোখে তার দিকে চেয়ে থাকা দেখে ঝুল দিয়ে মেখে ভাতগুলিকে ভিতরে পাচার করেই হাত ধুয়ে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলো। অনেক দিনের পুরোনো তোষক। বয়সের আর মানুষের শরীরের চাপে কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে। বালিশটা একদম খারাপ না। লেপটাও যথেষ্ট উষ্ণতা দেয় অনিক কে। শীতের রাতে উষ্ণ লেপের নিচে প্রবেশ করলেই এগারো বছরের ছেলের ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু পেটের রয়ে যাওয়া ক্ষুধা তা দিচ্ছে না। তবে এর দাওয়াই অনিকের জানা আছে ; সে বিছানা থেকে নেমে রান্না ঘরে রাখা জলের পাত্র থেকে তিন গ্লাস জল খেয়ে বিছানায় ফেরার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়ে ।



আরো খবর