গল্প… রতনের প্যাডেল চাপা জীবন

কুমার সৌরভ
ছেলেটি প্যাডেল চাপতে পারছিল না। রিক্সার সীটে বসে প্যাডেল চাপতে কষ্ট হচ্ছে তার খুব। তাই সিটের উপর দাঁড়িয়ে পা দু’টি নীচের দিকে জোরে জোরে ঠেলে প্যাডেল পুরোটা ঘুরাতে চাইছে সে। পুরো প্যাডেল ঘুরালে রিক্সার গতি বাড়ে। গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছা যায়। যত দ্রুত চলা তত বেশি ইনকাম। ছেলেটির মাথায় কখন ২ শ’ টাকা রোজগার হবে সেই চিন্তা। ২ শ’ টাকা রোজগার হলে ৫০ টাকা রিক্সার ভাড়া দিয়ে বাকি দেড় শ’ টাকা দিয়ে সে বাবার জন্য একটি ইনজেকশন কিনতে পারবে। কিন্তু পুরো প্যাডেল ঘুরাতে পারে না। ফলে প্যাডেলের অর্ধেক চেপে চেপে উবু হয়েই রিক্সা চালাতে হচ্ছিল তাকে। এভাবে রিক্সা চালাতে গিয়ে সে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ছিল। বার বার মুখ দিয়ে বেরোনো আ.. উ.. শব্দ শুনে তার এই কষ্ট বুঝা যায়। কষ্ট হলেও থামে না বালকটি। তার যে দুই শ’ টাকা উপার্জন করতেই হবে।
ঘটনাক্রমে আমি তার রিক্সার যাত্রী ছিলাম। বালকটির কষ্ট দেখে বললাম- ‘একটু জিরিয়ে নে বাবা’। সে বলল- ‘না স্যার, প্রবলেম নাই।’ আমি তার মুখে ইংরেজি শুনে চমকে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘নাম কী তোমার?’ ও বলল- ‘রতন’।
রতন অর্ধবৃত্তাকারে প্যাডেল চেপে রিক্সা টানছিল। আমি তার সাথে ইচ্ছে করেই আলাপ জমিয়ে তুললাম। এটি আমার অভ্যাস। রিক্সায় উঠে চালকের সাথে নানা বিষয়ে গল্প জুড়ে দেয়া আমার পুরনো নেশা। এতে সময় দ্রুত চলে যায়। আলাপ শেষ হওয়ার আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। আর নানা জনের নানা কাহিনি শুনে জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলিও কিছুটা পূর্ণতা পায়।
এমন পথচলতি আলোচনায় যা জানা যায় তা এরূপ:
রতনরা দক্ষিণ সুনামগঞ্জের নোয়াখালি গ্রামের অধিবাসী। গ্রামে দারিদ্রতার কারণে তার বাবা শহরে চলে আসেন বছর দুই আগে। সাথে রতন ও রতনের মা। রতনের বাবা দিরাই থাকতেই রিক্সা চালানো শিখেছিলেন। শহরে এসে প্রথমে আরেক ড্রাইভারের রিক্সা ভাগে চালাতেন। কারণ নতুন হওয়ায় কোন মালিক তাকে রিক্সা দিতে ভরসা পাচ্ছিল না। রতনের বাবা তার পরিচিত এক ড্রাইভারকে শহরে রিক্সা চালানোর ইচ্ছার কথা জানায়। সেই ভাগে রিক্সার ব্যবস্থা করে দেয়। এভাবেই রতনের বাবার শহরে জীবিকা পর্ব শুরু। বনানীপাড়ার বস্তির ছোট একটি খুপরি ঘর ভাড়া নেয় সে। মাসে ১ হাজার টাকা ভাড়া। কারেন্ট বিল দিতে হয় না। একটি বাল্বের পয়েন্ট দেয়া আছে ঘরের ভিতরে। মালিকের শর্ত ওই পয়েন্টে ১৮ ওয়াটের এনার্জি লাইট লাগাতে হবে। রাত দশটার পর মেইন সুইচ নিভিয়ে দিত মালিক। রান্নাঘরের ব্যবস্থা কমন। বস্তির দশটি পরিবারের জন্য একটি গ্যাসের চুলা। লাইন দিয়ে রান্না করতে হত রতনের মাকে। রতনকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয় হাছননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত গ্রামের বিদ্যালয়ে। টিসি এনে চতুর্থ শ্রেণিতেই ভর্তি হল। পড়াশোনায় ভাল হওয়ায় রতন সকল স্যার ও দিদিমনিদের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়ে উঠে। ১৫০ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে ১৫ নম্বর হয়ে সে চতুর্থ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষা পাস করে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে। স্যারদের অগাধ বিশ্বাস এই ছেলেটি জেএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাবেই। স্কুলের যারা ভাল ছাত্র ছাত্রী এমন ৩০ জনকে নিয়ে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করেন প্রধান শিক্ষক। মাসে ২ শ’ টাকা করে বেতন। স্কুল শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত আরও দুই ঘণ্টা বিশেষভাবে পড়ানো হয় ওই ব্যাচকে। রতন ৩০ বিশেষ ছাত্রের অন্যতম । বিশেষ ক্লাসের ফিসের ২ শ’ টাকা প্রথম মাসেই সময়মত দিতে ব্যর্থ হয় রতন। রতনের বাবা টাকা জোগাড় করতে পারেন নাই। কারণ ততদিনে রতনের বাবার রোজগার অনেক কমে গিয়েছিল। প্রায়ই পেঠের ব্যথায় আক্রান্ত হতেন তিনি। ফার্মেসি থেকে দু দশ টাকার গুল্লি ক্যাপসুল এনে খেয়েও উপসমের লক্ষণ নেই। তাই পুরো দিন রিক্সা চালাতে পারেন না। এক ঘণ্টা চালিয়ে আরও এক ঘণ্টা বসে থাকেন। রতন ছাত্র ভাল হওয়ায় স্যাররা বেতন না পেয়েও তাকে বিশেষ ক্লাস থেকে বের করে দেন নি। এভাবেই পিএসসি পরীক্ষার সময় চলে এল।
১ নভেম্বর পিএসসির প্রথম পরীক্ষা দিয়ে মহাখুশি রতন। লাফাতে লাফাতে বাসায় এসে মার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছে। রতনের মার মুখে খনিকের জন্য একটু খুশির হাসি উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। তিনি রতনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। রতন বুঝতে পারে না কেন তার মা কাঁদছেন।
পরের পরীক্ষার আগে তিন দিন গ্যাপ। রতন ভাল করে পড়াশোনা করছে। ঠিক পরীক্ষার আগের দিন রতনের বাবার পেটের ব্যথা প্রচ-রকম বেড়ে গেল। সহ্যের বাইরে । অনবরত চিৎকার করছেন তিনি ব্যথার চোটে। বিছানায় শুয়ে থাকতে পারছে না। বিছানা থেকে উঠে ডান হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে মাথা নুইয়ে এনে হাঁটুর কাছে রেখে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ব্যথা কমে না। আবার বিছানায় লুটিয়ে পড়েন। আর সারা বিছানাময় গড়াতে থাকেন । ফার্মেসির ট্যাবলেট খাওয়ানো হলো। কিন্তু কিসের কি, ব্যথা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। রতনের বাবা চিৎকার করে বলে চলেছে- ‘ও আল্লা গো, মেরে ফেল। এত কষ্টের চাইতে মরে গেলে শান্তি।’ রতন বাবাকে জড়িয়ে ধরে জোড়ে কেঁদে উঠল। রতনের মা পাশের খুপরির এক রিক্সাড্রাইভারকে এনে বললেন, ‘ভাই রতনের বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সাহায্য করেন।’ হাসপাতালে নেয়া হলো রাতেই। হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে একজন ওয়ার্ডবয় রোগীর অবস্থা দেখে ভিতরে যেয়ে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে রতনের মার হাতে একখানা স্লিপ ধরিয়ে দিলেন। মুখে বললেন-‘রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। আপনারা তাড়াতাড়ি সিলেট নিয়ে যান’। বস্তির লোকজন সবাই মিলে দুই হাজার টাকা তুলে দিলেন রতনের মার হাতে। ওই টাকা সম্বল করেই তিনি অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে সিলেট রওয়ানা হলেন। রতনও সঙ্গী হল তাদের। রতনের আর জেএসসি পরীক্ষা দেয়া হলো না।
সিলেটে রতনের বাবার ক্যানসার ধরা পড়ল। ডাক্তার বললেন, ‘ক্যানসারের শেষ স্টেজ। নিরাময় কঠিন। উপশম ব্যয়সাপেক্ষ। এই চিকিৎসা হাসপাতালে রেখে দেয়া যায় না। আপনাদের বাইরে এর চিকিৎসা করাতে হবে।’ রতনের মা বলল, ‘আমরা এত টাকা পাব কোথায় ডাক্তার সাব। যা হয় আপনারাই করুন।’ তখন ডাক্তার একটি প্রেসক্রিপসন লিখে দিয়ে বললেন-‘হাসপাতালে রেখে লাভ নেই। বাড়ি নিয়ে যান। ঔষধ লিখে দিয়েছি। খাওয়াবেন। ব্যথা বেশি হলে এই ইঞ্জেকশনটা দেওয়াবেন।’ বলে প্রেসক্রিপসনে একটি ঔষধের নাম দেখিয়ে দিয়ে ওর পাশে কলমের মোটা দাগ দিলেন।
এর পর থেকে হাছননগর প্রাইমারি স্কুলের মেধাবী ছাত্র রতনের রিক্সাচালকের জীবন শুরু। আজ তার বাবার পেটে ব্যথা খুব বেশি। তাই রতনের দুই শ’ টাকা রোজগার করার তাগিদ বেশি।

জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আজ সকালে একটি সেমিনারে যাব বলে প্রস্তুতি নিচ্ছি। গোসল ও নাস্তা করে বেরোতে গিয়ে দেখি পকেটের মানিব্যাগ নেই। টেবিল, ড্রয়ার, ঘরের কোথাও খুঁজে মানিব্যাগটি পেলাম না। ভাবলাম, গতরাতে কখনও এটি হয়ত হারিয়ে ফেলেছি অথবা পকেটমার কেটে দিয়েছে। মানিব্যাগে কিছু টাকা ছিল। তারচাইতেও জরুরি কিছু কাগজপত্র ছিল যেগুলোর জন্য বেশ কিছু অসুবিধা হবে। মন খারাপ করেই সেমিনারের উদ্দেশ্যে বেরোলাম।
আন্তর্জাতিক শিশু দিবস উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসন এই সেমিনারের আয়োজক। সেমিনারের আজকের প্রতিপাদ্য হলো ‘শিশুশ্রম নিরোধে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য’। বেশ সারগর্ভ বক্তব্য দিলেন অনেকেই। আমিও প্যানেল আলোচক ছিলাম। ডায়াসে উঠে যা বললাম আসলে সেরকম বলার কোন প্রস্তুতি ছিল না আমার। কথাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে মুখে চলে এসেছে। অনেকটা ঘোর লাগা মানুষের মতো। গতকাল রতনের যে গল্প শুনেছি সেটির বর্ণনা দিয়ে আমি বললাম, ‘এই রতনদের দায়িত্ব নেয়ার মতো যোগ্য হয়েছি কি আমরা? যদি না হই তাহলে শিশুশ্রম নিরোধ বিষয়ে কোন কথা বলার অধিকার নেই আমাদের। কারণ এই রতন শিশু বয়সে রিক্সা চালিয়ে যদি তার বাবার ব্যথার ঔষধ কিনতে পারে তার মার মুখে আহার তুলে দিতে পারে তাহলে সে আমাদের নমস্য। আমি এই শিশুশ্রমকে সমর্থন করি।’ মিলনায়তনের সামনে এবং অতিথিদের চেয়ারে মৃদু গুঞ্জরন শুরু হলো। একটানা কথা বলে ঘোরের মধ্যেই আমি নেমে এলাম। নিজের আসনে বসলাম। পাশের একজন যিনি একটি সামাজিক সংগঠনের সভাপতি, তিনি বললেন, ‘ভাই আপনি এ কি বললেন, আপনি তো শিশু শ্রমের পক্ষে ওকালতি করলেন’। আমি মুখ খিচিয়ে বলে উঠলাম- ‘হ্যাঁ করেছি। আপনার কোন সমস্যা আছে?’। ভদ্রলোক অপ্রস্তুত হলেন। বললেন ‘না সেরকম নয়। তবে রতনরা যদি পড়াশোনা তুলে রেখে রিক্সা চালানোয় লেগে যায় তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় বলুন’। আমি বললাম, ‘ঠিক বলেছেন, আমাদের ভবিষ্যৎ সত্যিই অন্ধকার। আজ এই যে রতনের মতো একটি মেধাবী ছেলে জীবনের প্রয়োজনে নষ্ট হয়ে গেল সেখানে আপনাদের তথা এই সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়?’ তিনি ছাড়বার পাত্র নন। কুতর্কের ঝুড়ি খোলে বললেন, ‘তার মানে এই নয় রতনের শিশুশ্রমকে সমর্থন করবেন। একজন রতনের জীবনকে নষ্ট করার কোন অধিকার নেই আপনার’। রাগে আমার পিত্তি জ্বলে গেল। কথায় সেই ঝাঁজ বেরিয়ে এলো শুকনো মরিচগুড়া মেশানো পানি জোর করে কাউকে খাইয়ে দিলে তার মুখের যে আকার ধারণ করে সেরকম হয়ে উঠা আমার মুখ থেকে। বললাম, ‘রতন মরে গেলেই বোধ করি আপনাদের সুবিধা। তাহলে তার শিশুশ্রম নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না আপনাদের। এইভাবে দরিদ্র পরিবারগুলোর কয়েক কোটি শিশুকে মেরে ফেলার একটি মেগা প্রকল্প পাস করান, দেখবেন শিশুশ্রম রোধে আন্তর্জাতিক পুরষ্কার জোটে যাবে।’ ভদ্রলোক কথা না বাড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। এক সারি পিছনে গিয়ে একটি খালি চেয়ারে বসে আগুনের গোলার মতো করে চোখ দুটি আমার দিকে মেলে দিলেন কিছু সময়ের জন্য। যেন এটি চোখ নয়। আনবিক অস্ত্রবিশেষ। তিনি সুইচ টিপলেই আমাকে উড়িয়ে নিয়ে ছাই করে ভাসিয়ে দিবে বাতাসে।
প্রচ- বিরক্তি নিয়ে সেমিনার থেকে বেরিয়ে এলাম। সারা শহরময় ঘুরলাম। বলার ঘরে বসে চা সিঙারা খেলাম। কালিবাড়ি রন’র ইলেকট্রিকের দোকানে মুখরা বন্ধুদের সাথে কিছু সময় আড্ডা মারলাম। কিন্তু কিছুতেই ভিতরটা শান্ত হচ্ছে না। কেবলই সেমিনারের বুদ্ধিজীবী নামের কিছু মোসাহেব প্রকৃতির লোকের চাটুকারিতা আর মিথ্যার ভাড়ামী সুলভ কথাগুলো মনে আসছিল। বাসায় ফিরে এলাম।

রতনের বাবার খবর জানার জন্য মনটা বেশ টানছিল। কোথায় পাই তাকে? চলে আসলাম বনানীপাড়া। খোঁজে খোঁজে সেই বস্তি বের করলাম যেখানে রতনরা থাকে। জিজ্ঞেস করলে বস্তির অনেকেই রতনকে চিনতে পারে। জানতে চাইলাম, রতন এখন কই। বস্তির একজন বলল, গতরাতে রতন বাসায় আসে নি। বাবার ইঞ্জেকশন আনার কথা ছিল তার। রতনের মা অপেক্ষায় বসে ছিলেন। এদিকে তার বাবার অবস্থা ক্রমশ সংকটাপন্ন হয়ে উঠে। মধ্যরাতের দিকেও যখন রতন বাসায় আসল না তখন বস্তির লোকজন রতনের বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার আগে পথেই তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালে না গিয়ে তারা রতনের বাবার মৃতদেহ নিয়ে বস্তিতে ফিরে আসে। তখনও রতনের দেখা নেই। বস্তির কয়েকজন রতনের খোঁজে লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাফিক পয়েন্ট খোঁজে এলো কিন্তু তার কোন হদিস বের করতে পারল না। এদিকে ঘরে লাশ বেশিক্ষণ রাখার উপায় নেই। সকলের পরামর্শক্রমে সকালবেলা লাশের গোসল করিয়ে দাফন করে ফেলা হয়। মৃত বাবার মুখখানি শেষ দেখার সুযোগ হল না রতনের। লাশ দাফনের পর সকলে বাসায় ফিরে এলেও রতন তখনও নিখোঁজ। একদিকে স্বামীর মৃত্যু অন্যদিকে ছেলের নিখোঁজ মিলিয়ে রতনের মার অবস্থা খুব খারাপ। বস্তিবাসী জানালেন, তিনি বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। যখন জ্ঞান আসছে তখন কেবল রতন রতন বলে চিৎকার করছেন।
আমি রতনের ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম তোশকবিহীন একটি কাঠের ভাঙ্গা চৌকিতে নিথর শুয়ে আছেন হাড্ডিকঙ্কালসার এক মহিলা। আমি নিরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। জ্ঞান না ফিরায় কথা বলা সম্ভব হয় না রতনের মার সাথে। বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। ‘আবার আসব’ বলে একরকম পালিয়ে ছুটে এলাম বনানীপাড়া বস্তি থেকে।

এর মাঝে কয়েকদিন কেটে গেছে। আমি রতনের কথা ভুলে দৈনন্দিন কাজকর্মে ডুবে গেছি। ততদিনে অন্যান্য দিবসগুলো সামনে চলে এসেছে। নারী দিবস, পুরুষ দিবস, ডিম দিবস, স্বাক্ষরতা দিবস কত কি…। সবগুলো দিবসেই সুন্দর ব্যানারের পেছনে সরকারি-বেসরকারি সমাজগণ্য ব্যক্তিদের ফটোসেশনের র‌্যালি হয়, মিলনায়তনে আলোচনাসভা বসে। সেখানে শব্দ দিয়ে বেলুন বানানো হয়। সেই বেলুন আকাশে উড়ানো হয়। বেলুনগুলো আকাশে উড়াউড়ি করে। বাহা বাহা! চমৎকার শব্দকল্পদ্রুম। বেলুন মিইয়ে পড়ে আর ভদ্রজনেরা নেতিয়ে পড়ে হাই তোলেন। আরেকটি দিবসে কী বলবেন তার মশক্ করেন। পত্রিকায় সুন্দর করে সেসব মহাজনদের ছবি ও বাণী ছাপানো হয় গুরুত্ব দিয়ে।
বিকেলে আনমনা বসে ছিলাম বারান্দায়। এমন সময় দেখলাম গেট ঠেলে কে জানি বাসায় ঢুকছে। ভিতরে আসতেই দেখলাম রতন এসেছে। তার চোখ মুখ শুকনো। পরনের জামাটি ছেড়া। ময়লা। চুলগুলো  এলোমেলো, শুকনো, রুক্ষ। দাঁত কয়েকদিনের ময়লার আস্তরণ জমে হলুদ হয়ে আছে। বারান্দার কাছে এসে বলল, ‘আসব স্যার?’। যেন বহুদূরের কোন গ্রহ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসা কোন প্রাণ নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে, আশ্রয় চাইছে অচেনা আরেক ভুপ্রকৃতিতে। আমি উঠে পড়লাম। রতনকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এলাম। তাকে বসালাম পাশের চেয়ারে। বললাম, ‘রতন বসো তুমি, আমি আসছি’। রতন আমার হাত টেনে ধরল। বলল, ‘বসব না স্যার, আপনার একটা জিনিস আছে আমার কাছে, সেটি ফেরৎ দিতে এসেছি’। আমি তাকে বাধা দিয়ে বললাম, ‘সে হবে সব। তুমি এখন বস।’ ঘরে গিয়ে একটি প্লেটে করে ভাত তরকারি সাজিয়ে নিয়ে এলাম। টেবিলে রেখে বললাম ‘রতন খেয়ে নাও আগে, পরে তোমার সব কথা শুনব’। ভাতের প্লেট দেখে তার চোখ চকচক করে উঠল। দেখলাম একবার জিভ চেটে নিল। তার পেঠে প্রচ- ক্ষিধে। গোগ্রাসে খেতে শুরু করল রতন। আমি ভিতর থেকে আরেকটু ভাত তরকারি এনে দিলাম। কোন কথা না বলে সে খেয়ে চলল। খাওয়া শেষ করে পানি খেল দুই গ্লাস। এরপর প্লেটগুলো তুলে নিতে চাইল। আমি বললাম, ‘থাক প্লেট সরাতে হবে না তোমাকে, তুমি এবার বলো কোথায় ছিলে।’
রতন পেন্টের পকেট থেকে পুরনো কাগজে মোড়ানো একটি পুটলি আমার হাতে তুলে দিল। বলল, ‘স্যার এই জিনিসটি আপনার, সেদিন রিক্সায় ফেলে গিয়েছিলেন।’ পুটলি খোলে দেখলাম এটি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ। মানিব্যাগ খোলে টাকাসহ সমস্ত কাগজপত্র ঠিকঠাক পাওয়া গেল।
মানিব্যাগটি আমার হাতে গুঁজে দিয়েই রতন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরল।
আমি পিছনে ফিরে ডাকলাম, ‘যেও না রতন, সে রাতে তুমি কোথায় ছিলে বলে যাও।’
রতন যেন আমার কথা শুনতে পায় নি। সে নির্বিকারভাবে গেট পেরিয়ে রাস্তায় উঠল। রিক্সার সীটে উঠে আগের মতোই অর্ধবৃত্তাকারে প্যাডেল চেপে সড়ক ধরে চলে গেল।
আমি তার চলন্ত রিক্সার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তার সে রাতের অন্তর্ধানরহস্য আর জানা হলো না।