গানকে ভালবেসেছি, প্রতিদান আশা করিনি – মুকুল ঠাকুর

জয়ন্ত কুমার সরকার
মুকুল ঠাকুর নামেই এলাকায় পরিচিত তিনি। পুরো নাম মুকুল আচার্য্য। দিরাইয়ের উপজেলার খাড়াউড়া গ্রামের পূর্বপাড়ার আধা কাঁচা একটি ছোট্ট ঘরে স্ত্রী, তিন ছেলে ও নাতি নাতনিদের নিয়ে কোন রকমে দিনাতিপাত করছেন তিনি। ভাটি অঞ্চলের গাঁয়ে গাঁয়ে এবাড়ি ও বাড়ি গানের ফেরি করে বেড়ান তিনি।
উস্তাদ সুকুমার তালুকদার ও উস্তাদ কামাল পাশার শিষ্য মুকুল ঠাকুর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গান গেয়ে মানুষের মন জয় করেছেন। বছর কয়েক আগে গান শেষে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত ভেঙ্গে গেলে আর বেহালা ধরা হয় নি। উঠা হয়নি কোন অনুষ্ঠান মঞ্চে। দক্ষিণ সুরমার মিরন আলী ফকির বিদেশ থেকে এনে যে বেহালাটি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন সেই বেহালাটিও নষ্ট হয়ে গেছে। সারিয়ে তোলার ইচ্ছা থাকলেও উপায় দেখছেন না তিনি। মনের মধ্যে তীব্র কষ্টকে সাথী করে গাঁয়ের এ বাড়ি ও বাড়ি হেঁটে গানের ফেরী করেন তিনি।
মুকুল ঠাকুর লিখেছেন ৫০০ শতাধিক কীর্তন, লোকগান, ভাবভক্তি ও ধামাইল গান। নিজেই নিজের গানে সুর করেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিষ্যদের কন্ঠে তুলে দিচ্ছেন সে সুর। অর্থাভাবে খাতার পাতায় রয়ে গেলেও গ্রামের গানের আসরগুলোতে লোকমুখে জনপ্রিয় তাঁর গান। ‘বাঁশিটি বাজাইয়া বন্ধে কাদাইলে আমারে’, ‘নাম ধরিয়া বাজায় বািঁশ অন্তরেতে পুড়ে’, ‘যার লাগিয়া হইলাম দোষী মন দিলাম তার মন পাইলাম না’, ‘হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খিস্টান, ইশ্বর আল্লা গড ভগবান’, এমন অনেক গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাঁর।
মুকুল ঠাকুর বাবা মুকুন্দ আচার্যে্যর হাত ধরে ৫০ বছর পূর্বে গানের জগতে আসেন। বাবা মুকুন্দ আচার্য্য এলাকার একজন স্বনামধন্য গায়েন ছিলেন। বাজাতে পারতেন হারমোনিয়াম, খোল, বেহালা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রও। গানের প্রতি প্রচণ্ড টানেই ছুটে যেতেন গ্রামেরই উস্তাদ সুকুমার তালুকদারের বাড়িতে। উস্তাদ সুকুমার তালুকদারের বাড়িতে রাখা বেহালা, হারমোনিয়াম, দোতারা এসব বাদ্য যন্ত্রে হাত দিতেন মুকুল ঠাকুর। বাবা লক্ষ্য করলেন ছেলে বাদ্য বাজনা শিখতে চায়, গাইতে চায়। ছেলেকে ২০ বছর বয়সে উস্তাদ সুকুমার তালুকদারের নিকট বিদ্যা শিক্ষার জন্য প্রেরণ করলেন মুকুন্দ আচার্য্য। বছর তিনেক সুকুমার তালুকদারের সান্নিধ্যে থেকে মুকুল ঠাকুর হারমোনিয়াম, বেহালা বাজানো রপ্ত করেন। বেহালা বাজিয়ে গান গাওয়াতেই থেমে থাকতে রাজি নন মুকুল ঠাকুর। উস্তাদের কাছে তত্ত্বকথা শুনতে চান তিনি, বিশ্লেষণ চান গানের কথার। শ্যাম বিরহ, রাধা বিচ্ছেদ, শরিয়তী মারফতি সকল বিষয়ের জ্ঞান আহরনের জন্য প্রশ্ন করা শুরু করলেন। উস্তাদ সুকুমার তালুকদার তত্ত্বকথা, বিচার বিশ্লেষণ শেখার জন্য ভাটির সংগীত অঙ্গনের আরেক পুরোধা পুরুষ মালজোড়া গানের অপ্রতিদ্বন্ধী বাউল কামাল উদ্দিনের (কামাল পাশা) নিকট প্রেরণ করলেন শিষ্য মুকুল ঠাকুরকে। বাউল কামাল পাশা মুকুল ঠাকুরকে নিজের কাছে রেখে পরম মমতায় শেখাতে থাকলেন। মুকুল ঠাকুরের কপাল খারাপ, মাত্র ২ বছর সময় কাটাতে পেরেছিলেন বাউল কামাল পাশার সান্নিধ্যে। বাউল কামাল পাশার জীবনাবসানের পর মুকুল ঠাকুর নিজেই গান গাওয়া শুরু করেন। ৫০ বছরের এই সংগীত জীবনে সিলেট অঞ্চলের রুহী ঠাকুর, রনেশ ঠাকুর, সিরাজ উদ্দিন, সূর্যলাল দাস, ঢাকা অঞ্চলের বিশিষ্ট বাউল খালেক দেওয়ানসহ এই অঞ্চলের সকল নামীদামী সব বাউলদের সাথে সমান তালে মালজোড়ার গানের মঞ্চ মাতিয়েছেন গানে, কথায়, যুক্তিতে।
মুকুল ঠাকুর অতীতের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, আমি নারয়ানগঞ্জে দেশের প্রখ্যাত বাউল শিল্পী খালেক দেওয়ান ও ভৈরবে লাল মিয়া বাউলের সাথে যখন মালজোড়া করেছি— তখন মনে মনে ভাবতাম আমি হয়তো কিছুটা শিখতে পেরেছি। উজানধলের রুহী ঠাকুরের সাথেও একাধিকবার মালজোড়া করেছি। ঐ সময় লন্ডনে অবস্থানরত দক্ষিণ সুরমার মিরন আলী ফকির লন্ডন থেকে নিয়ে আসা একটি বেহালা আমাকে উপহার দিয়েছিল। একবার গান করে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার ডান হাত ভেঙ্গে যায়। হাত ভাল হয়ে গেলেও বাড়িতে এসে আমি পর পর দুইবার স্টোক করি। শারীরিকভাবে অসুস্থতা আমাকে ঘিরে ধরে। আমি আর মঞ্চে ফিরে যেতে পারি নি।
জানা যায়, গানের প্রতি ভালবাসাতেই ছোট বেলায় তিনি নিজেই বাঁশের বাঁশি বানাতেন ও বিক্রি করতেন গ্রামীণ মেলায়, হাটে, ঘাটে ও গঞ্জে। বাঁশি বিক্রি করতে হলে নিজেকে বাজিয়ে শুনাতে হয় ক্রেতাদের। বেশি বািঁশ বাজালে দাতের ক্ষতি হয় এই ভেবে বাবা মুকুন্দ আচার্য্য এ পেশা ছেড়ে দিতে বললে তিনি আর বািঁশ তৈরি করেন না। ছেড়ে দিয়েছেন এই পেশা। তবে তার ছোট ছেলে লক্ষণ আচার্য্য কিছুটা রপ্ত করেছে বাঁশের বাঁশি তৈরি করা। কিন্তু বর্তমানে গুরুত্ব কমে যাওয়ায় সেও এসবের প্রতি আর মনোযোগী নয়।
তিনি বলেন, আমি গান লিখেছি হাজারের মতো হবে। ১৩৮২ বাংলার বন্যার সময় একটি বড় গানের পান্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেছি। এখনো আমার কাছে ৫০০ শতাধিক গান রয়েছে। এর মধ্যে ধামাইল রয়েছে ২০০’এর মতো। শিষ্যরা যখন আমার ধামাইলগুলো পরিবেশন করে। এগুলো যখন ফেসবুকে দেখা যায়, লোকেরা আমাকে এনে দেখায় আমার তখন আনন্দে বুকটা ভরে উঠে। আমার গানগুলো কেউ যদি মনযোগ দিয়ে শুনে, নিশ্চয়ই তার ভাল লাগবে আমি বিশ্বাস করি।
সম্প্রতি আশীষ দে ও শ্রীকান্ত বর্দ্ধন সম্পাদিত সিলেটের ধামাইলের ইতিকথা বইয়ে মুকুল ঠাকুরের ১৫ টি গান প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা আমার গানগুলো কেউ একজনে প্রকাশ করুক। বই আকারে থাকুক। গানেই যখন মন মজিয়েছি, গানের সাথেই মরতে চাই।
তিনি বলেন, বাউল আবদুল করিমের অসংখ্য শিষ্য ছিল। অনেক জ্ঞানীগুণি ব্যক্তি উনার সৃষ্টি ও কর্মকে কদর করে উনাকে প্রচার ও প্রসারে সহযোগিতা করেছেন। আমাকে সহযোগিতা করে এমন একজন আমি খুঁজে পাই নি।
তিনি বলেন, গানকে ভালবেসে নিজেকে অন্য কোন পেশায় জড়াতে পারি নি। মূর্তি গড়তে জানি, বিভিন্ন সময়ে পূজা পার্বনে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মূর্তি গড়ার কাজ করি। এই কাজটিতেও সঠিক সময় দিতে পারি নি। জীবন সায়াহ্নে এসে নিজে কি পেলাম তা নিয়ে কখনো চিন্তা করি না। কিন্তু নিজের বাচ্চাদের জন্য কিছু করে যেতে পারি নি। কষ্টের কথা বলতে বলতে চোখের কোনে জল আসল মুকুল ঠাকুরের। বললেন, ওদের বসাবাসের জন্য একটি ঘর পর্যন্ত করতে পারলাম না।
মুকুল ঠাকুরের পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জমতইন গ্রামে। সংগীত প্রিয় ক’জনের আমন্ত্রনে স্বপরিবারে মুকুল ঠাকুরের বাবা মুকুন্দ আচায্যর্ খাগাউড়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সঙ্গীত গুরু হিসেবে জীবন শুরু হয় ভাটির জনপদ খাগাউড়ায়। খাগাউড়া গ্রামে জন্ম নেয়া মুকুল ঠাকুরের পরিবারে উনার স্ত্রী ও লিটন আচার্য্য, নারায়ন আচার্য্য ও লক্ষন আচার্য্য নামে তিন ছেলে সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে লিটন ও নারায়ন আচার্য্যকে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ করিয়েছেন। মেয়ে সুকৃতি আকৃতি এবং শেলীকেও পাত্রস্থ করেছেন মুকুল ঠাকুর।
উত্তারাধিকারী সূত্রে সঙ্গীত সাধনা ও লোকজ সংগীতের বাহক মুকুল ঠাকুরের জীবনাবসানের পূর্বে গানগুলো সংরক্ষিত হবে, বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন তালিকাভূক্ত হবেন, লোকে একসময় কদর করবেন এই আশায় রয়েছেন হাওরপাড়ের লোকগানের অনন্যজন মুকুল ঠাকুর।