গারো মাঠ নিয়ে আশাজাগানিয়া বৈঠক

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
জেলার তাহিরপুর উপজেলার বড়গুপ টিলার গারোদের খেলার মাঠ নিয়ে গত সোমবার সালিশ বৈঠক হলেও কোনো মীমাংসা হয়নি। তবে বৈঠকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্য থেকে মাঠটি নিয়ে গারোরা আশার আলো দেখছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) উপস্থিতিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
উত্তর বড়দল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে বৈঠকে বক্তব্য দেন তাহিরপুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দিন খন্দকার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী মর্তুজা, তাহিরপুর থানার ওসি (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম, সদর ইউপি চেয়ারম্যান বুরহান উদ্দিন, উত্তর বড়দল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জামাল উদ্দিন, উত্তর বড়দল ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি মাসুক মিয়া, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুতালিব, আদিবাসী নেতা পরিতোষ চাম্বুগাং, রমেশ জুয়েল মারাক, যতীন্দ্র রাকসাম, নুরুল ইসলাম মাস্টার, শঙ্কর মারাক, আন্দ্রীয় সলমার, সুনীল দাজেল, ইউপি সদস্য সুষমা জাম্বিল, স¤্রাট মিয়া প্রমুখ।
বৈঠকে উপস্থিত সবাই বলেন, এলাকার কেউ যেন নিরীহ আদিবাসীদের জানমাল ক্ষতি করার চেষ্টা যাতে না করেন। সেজন্য প্রত্যেককে সতর্ক থাকতে হবে। এ নিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি যাতে না হয়, সে ব্যাপারেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
মাঠ প্রতিষ্ঠাকারী প্রবীণ আদিবাসী নেতা রমেশ জুয়েল মারাক এলাকায় খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চায় আদিবাসীদের ঐতিহাসিক অবদান তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তার এই বক্তব্য সমর্থন করেন সালিশকারীরা। প্রবীণ আদিবাসী যতীন্দ্র রাকসাম সম্প্রতি মাঠ দখল নিয়ে উত্তেজনার জেরে দুস্কৃতকারীরা সাইনবোর্ড, স্কুলের বৈদ্যুতিক লাইন তুলে নেওয়াসহ নানা উৎপাতের কথা তুলে ধরে তাদের উদ্বেগের বিষয়টি নজরে আনেন।
যুবলীগ নেতা মাসুক মিয়া জনপ্রতিনিধিদের ভোটের দিকে না চেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার কথা বলেন। মাঠ প্রতিষ্ঠায় আদিবাসীদের ভূমিকাকে তিনি স্মরণ করেন।
উত্তর বড়দল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন বলেন, ছোটবেলায় আমরা বড়গুপ টিলাতে গারো ছাড়া কোনো বাঙালিকে দেখিনি। বন্যা হলে মাহারাম এলাকার কিছু পরিবার উঁচু স্থান হিসেবে বড়গুপ টিলায় আশ্রয় নিত। এ আশ্রয় থেকেই কিছু বাঙালি পরিবার এখানে বসতি স্থাপন করেছে।
তিনি বলেন, এই মাঠকে আমরা গারো মাঠ হিসেবেই চিনি। মাঠকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আগে যেভাবে আদিবাসী-বাঙালি ভাই ভাই হয়ে ছিলাম, এখনও আমরা সেভাবে থাকতে চাই।
নুরুল ইসলাম মাস্টার বলেন, এই মাঠ প্রতিষ্ঠা করে গারো আদিবাসীরা। তারাই এ এলাকায় খেলাধুলার চর্চা করে। আমরা এ কারণে তাদের শ্রদ্ধা করি। মাঠ প্রতিষ্ঠা ও খেলাধুলার মাধ্যমে যুবসমাজকে ভালো কাজে ধাবিত করায় আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী মর্তুজা বলেন, আজকের সালিশের প্রবীণদের বক্তব্য থেকে প্রমাণ হচ্ছে, এলাকার মধ্যে আদিবাসীরাই নিয়মিত খেলাধুলা চর্চা করে যুবসমাজকে আলোর পথ দেখাচ্ছে। অর্ধ শতাব্দী আগে গারো আদিবাসীরা এই মাঠ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ কারণে আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। কোনো বাঙালি যাতে গায়ের জোরে আদিবাসীদের সঙ্গে উস্কানিমূলক আচরণ করতে না পারে, সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আদিবাসী নেতা সুনীল দাজেল জানান, শুধু খেলার ওই মাঠটিই নয়, তাদের গির্জা ও স্কুলের নিরাপত্তা নিয়েও গারোরা দুশ্চিন্তায় আছেন।
বৈঠক প্রসঙ্গে ইউএনও পদ্মাসন সিংহ বলেন, বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে সবাইকে নিয়ে আমি বিষয়টি নিষ্পত্তি করে দেব। এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চাই।