গা ঢাকা দিয়েছেন দালাল জামায়াত নেতা এনামুল- ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে সিলেটের ৭ যুবকের মৃত্যু

সু.খবর ডেস্ক
ইউরোপ! সিলেট তথা বাংলাদেশের মানুষের জন্য বড় এক স্বপ্নের নাম। আর সেই স্বপ্নকে জয় করতে বিগত কয়েক বছরে সিলেটের ট্রাভেল এজেন্সি এবং দালালদের লোভনীয় ফাঁদে পা দিয়ে বড় ধরণের ক্ষতির শিকার হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। বড় অংকের টাকা তো গেছেই সেই সাথে গেছে অসংখ্য মানুষের তাজা প্রাণ।
সর্বশেষ দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে ইউরোপ যাবার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে মারা গেছেন সিলেটের ৭ যুবক। সিলেট থেকে ইউরোপে পাঠানোর নামে তাদের কাছ মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া দালালের পরিচয় পাওয়া গেছে। তার নাম এনামুল হক এনাম। সে সিলেট নগরীর রাজা ম্যানশনের ৩য় তলার ‘নিউ ইয়াহিয়া ওভারসীজ’ এর স্বত্তাধিকারী।
তিনি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের পনাইরচক গ্রামের মৃত মো. আবদুল খালিকের ছেলে। এনামুল হক এনাম জড়িত রয়েছেন জামায়াতের রাজনীতির সাথে।
জানা যায়, শরীফগঞ্জ ইউনিয়ন জামায়াতের এই নেতা আগে হুন্ডি ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে দেখা যায় তাকে। মাওলানা হাবিবুর রহমানকে প্রার্থী করতে গোপন বৈঠকসহ বিভিন্ন সভা সমাবেশে অংশও নেন এনাম। জনশ্রুতি আছে এসময় জামায়াতের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন তিনি।
এ ব্যাপারে মাওলানা হাবিবুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে।
নগরীর জিন্দাবাজার রাজা ম্যানশনের ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে মাসিক ৭ হাজার টাকা ভাড়া হিসেবে রাজা ম্যানশনের ৩য় তলায় নিউ ইয়াহিয়া ওভারসীজ নামে ট্রাভেল এজেন্ট খোলেন এনাম। মূলত অবৈধপথে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ পাঠানোই ছিল তার মূল ব্যবসা। সাইফুল নামের এক সহযোগী তাকে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক যুবকদের খোঁজ এনে দিত। সেসব বেকার যুবকদের লোভনীয় উপার্জনের প্রস্তাব দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতো তারা। এরপর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে হতো চুক্তি। চুক্তির পর বিভিন্নভাবে দেশ থেকে দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হতো অভিবাসন প্রত্যাশীদের। এরপর নানা নির্যাতনের মাধ্যমে চলতো অতিরিক্ত টাকা আদায়। কখনো আবার টাকা লোপাট করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তবে ট্রাভেল এজেন্ট চালানোর বৈধ কোন লাইসেন্স ছিল না তার। ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাবের সদস্য পদও পান নি এনাম। তবে নির্বিঘেœ ব্যবসা করেছেন এতো বছর ধরে। গত শুক্রবার ভূমধ্যসাগরে ট্রলার ডুবিতে সিলেটের ৭ যুবক মারা যাবার পর গা ঢাকা দিয়েছেন এনাম। বন্ধ রয়েছে তার মুঠোফোনও। নিহতদের পরিবারের দাবি আট লাখ টাকা চুক্তিতে ইউরোপে পাঠানোর কথা ছিল তাদের। অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরেও নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকাও নিয়েছেন তিনি। প্রায় পাঁচ মাসে তিন দেশ ঘুরিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে লিবিয়া উপকূল থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে নৌকায় তুলে দেয়া হয় প্রায় ৮০ জনের একটি দলকে। কিন্তু তিউনিশিয়া উপকূলে সাগরে তলিয়ে যায় সেই নৌকা। অর্ধশতাধিক বাংলাদেশির সলিল সমাধি হয়।
এ ব্যাপারে আটাব সিলেটের সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউর রহমান খান বলেন, দালাল এনাম আটাবের কোন সদস্য নয়, তার ট্রাভেল এজেন্ট চালানোর কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। এছাড় ট্রাভেল এজেন্ট তো লোক পাঠানোর কথা নয়। ট্রাভেল এজেন্ট নাম দিয়ে এনাম আসলে মানব পাচারে যুক্ত ছিল।
এক্ষেত্রে আটাবের পক্ষ থেকে অবৈধ ট্রাভেল এজেন্টদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আটাবের পক্ষ থেকে একাধিকবার অবৈধ ট্রাভেল এজেন্টদের তালিকা প্রস্তুুত করে প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনিয়মিত ভাবে অভিযান চালানোয় এরা কয়দিন বন্ধ রেখে ফের মানব পাচারের মত ভয়ংকর কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে আহবান জানান।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ও শিপার এয়ার সার্ভিসের স্বত্তাধিকারি খন্দকার শিপার বলেন, যা ঘটেছে তা এক কথায় মর্মান্তিক। দুঃখ প্রকাশের ভাষা নেই আমাদের। তবে এক্ষত্রে আটাবেরও কিছুটা দায় আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
খন্দকার শিপার বলেন- শুধু এনাম কেন, লাইসেন্স ছাড়া ট্রাভেল এজেন্ট নাম লাগিয়ে মানব পাচারে যুক্ত অনেকেই। তাদের বিরুদ্ধে আটাবের পক্ষ থেকে কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন রকম ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
সূত্র : সিলেট ভয়েস