গুজব তৈরির কারখানা বাজার-সিন্ডিকেট

হঠাৎ লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব ও গুজব-তাড়িত লোকজনের অধিক পরিমাণে লবণ কেনার হিড়িককে সরকার প্রথম দিনেই মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। সোমবার রাত থেকে লবণ সংকটের এই গুজব ছাড়া হয়। ফেসবুক ও মুখে-মুখে এই গুজব দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুদি দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লেগে যায়। প্রত্যেকেই ৫ কেজি ১০ কেজি করে লবণ কিনা শুরু করেন। একসাথে এত পরিমাণ ক্রেতার উপস্থিতির কারণে সংগত কারণেই বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। এই সুযোগ কাজে লাগায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিবৃন্দ তাৎক্ষণিকভাবে এই গুজবের কথা প্রশাসনের নজরে আনেন। প্রশাসনও কোনো সময় ক্ষেপণ ছাড়াই বিভিন্ন বাজারে অভিযান শুরু করেন। এছাড়া লবণ সংকটের গুজবে কান না দেয়ার জন্য জনগণকে সচেতন করতে প্রচারণা শুরু করেন। এই তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে মঙ্গলবার প্রায় প্রতিটি বাজারেই লবণ নিয়ে যে সংকট তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছিল সেটিকে শুরুতেই প্রতিহত করা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার বলা হয়েছে, দেশে লবণের যে চাহিদা তার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয় এবং এই মুহূর্তে দেশে লবণের সরবরাহে কোনো সংকট নেই। পেঁয়াজ নিয়ে তৈরি করা সংকটের পরই লবণ নিয়ে এই সংকট তৈরির প্রচেষ্টার পিছনে কোন অপশক্তি জড়িত, এখন সময় এসেছে তাদের চিহ্নিত করা। পেঁয়াজের অত্যধিক মূল্য বৃদ্ধির পিছনে সরকার পরিষ্কারভাবে অপশক্তিকে দায়ী করেছেন। পেঁয়াজের কেজি যখন আড়াই শ’ টাকা ছাড়িয়েছিল, বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে তখন বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহের এত সংকট ছিল না। মিশর, চীন বা পাকিস্তান থেকে এ সময় যে পেঁয়াজ আমদানি করা হয় তার আমদানিমূল্যের প্রেক্ষিতেও পেঁয়াজের বাজার এত তেজি হওয়ার কারণ ছিল না। তার পরেও কয়েক দিন পেঁয়াজের কেজি আড়াই শ’ টাকা বা তার চাইতেও বেশি উঠে গিয়েছিল। এটি অবশ্যই মনুষ্য-সৃষ্ট সংকট। অল্প কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী সরাসরি এ জন্য দায়ী। এই অসাধু ব্যবসায়ীদের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসন্ধানী কোনো শক্তির যোগসূত্র রয়েছে কিনা সেটি গোপন বিষয়। বিভিন্নভাবে এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খোঁজলেও যতক্ষণ পর্যন্ত এর শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন সম্ভব হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এই পেঁয়াজ কেলেংকারীর জন্য অসাধু ব্যবসায়ীদেরই দায়ী করবেন সকলে। পেঁয়াজ থেকে মুনাফা লুটার পর এই গোষ্ঠীটি এখন লবণ থেকে অনুরুপ মুনাফা লুটার হীন চেষ্টায় নিয়োজিত হয়েছে কিনা এখন সেই সন্দেহই সকলের মনে বদ্ধমূল।
বাজারে সিন্ডিকেট বলতে একটা শব্দ প্রচলিত হয়েছে। বলাবাহুল্য এই সিন্ডিকেট একটি কালো শক্তি রূপেই অর্থনৈতিক জগতে পরিচিতি পেয়ে গেছে। এরা মাঝে মাঝে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়। এরা সংকট তৈরি করে অল্প সময়ে বিশাল পরিমাণ টাকা বাজার থেকে লুটে নেয়। সরকার এই সিন্ডিকেট সম্পর্কে সচেতন থাকলেও এদের দমন করতে একেবারেই ব্যর্থ। রাজনীতি-অর্থনীতি বিশ্লেষকরা এজন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি ও দর্শনকে দায়ী করেন। তাঁদের অভিমত, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মূলত ওই সিন্ডিকেট স্বার্থকেই রক্ষা করে থাকে। এজন্যই সিন্ডিকেট নামের আড়ালে অল্প কয়েক ব্যক্তি মাঝে মাঝে দানবের চেহারা নিয়ে সাধারণ মানুষের শান্তি ও স্বস্তি হরণ করে চললেও সরকারের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো এদের দমন করতে নিয়মিত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। এই ব্যর্থতার ফাঁক গলেই বেরিয়ে আসে পেঁয়াজ সংকট, ভোজ্য তেল সংকট, চিনি সংকট, হালে লবণ সংকট। চাল নিয়ে এমন কেলেকাংরি শুরুর আগাম সংকেতও পাওয়া যাচ্ছে। অর্থনীতির এমন লুটেরা চরিত্র দূর করতে হলে প্রথমে এবং সর্বাগ্রে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিকে গণমুখী ও সুষম করতে হবে। নতুবা মাঝে মধ্যেই এমন সংকট আসতে থাকবে।