‘গুলির ধানে’ চারা গজাচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি ও ইয়াকুব শাহরিয়ার
শিরিশ চন্দ্র দাশ। পাথারিয়া ইউনিয়নের নগর গ্রামের কৃষক তিনি। বন্যার শঙ্কা মাথায় নিয়ে দেড় দুইশ মন ধান তুলেছেন তিনি। বন্যার শঙ্কা কাটলেও দুঃশ্চিন্তা কাটেনি তাঁর। সবগুলো ধান এখনো রয়ে গেছে স্যাঁতস্যাঁতে। শুকাতেই পারেন নি। কারণ ধান কাটা ও মাড়াইয়ের পর থেকেই টানা বৃষ্টি চলছে। গুলিতে (মাড়াই করা ধানের স্তুপ) থাকতে থাকতে প্রায় সব ধানেই গজিয়েছে চারা। এভাবে আর দু’চারদিন চললে পুরোপুরিই নষ্ট হয়ে যাবে তাঁর সকল ধান। এ নিয়ে চিন্তিত এই কৃষল।
শিরিশ চন্দ্র দাশের ভাতিজা রিকন চন্দ্র দাশ বললেন, ধান পাকার আগে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার একটা শঙ্কা ছিলো। দুঃশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে অনেক কষ্টে সৃষ্টে ধান কেটে মাড়াই দেওয়ার পর থেকেই লাগাতার বৃষ্টি চলছে। গুলির সব ধানেই এখন চারা গজিয়েছে। এরকর আর দু’চারদিন চলতে থাকলে আমাদের সকল ধানই নষ্ট হবে।
এমন দুশ্চিন্তা শিরিশ চন্দ্র দাশ কিংবা রিকন চন্দ্র দাশের কেবল নয়। হাওরপাড়ের গ্রামে গ্রামে এই দুঃশ্চিন্তার গল্প এখন। দুঃশ্চিন্তা আর দুঃখ মাখা গল্প এখন শান্তিগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার শত শত কৃষকের।
ঘুর্ণিঝড় ‘অশনি’র প্রভাবে গত সপ্তাহ থেকে টানা বৃষ্টিপাত ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে জমি থেকে কেটে আনা ধান শুকিয়ে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকরা। শুকানোর জন্য ধানের খলায় যেসব ধান স্তুপ (গুলি) করে রাখা হয়েছে তা কোনো ভাবেই শুকানো যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ভেজা অবস্থায় ঢাকা থাকার কারণে গুলির ধানে গজাচ্ছে চারা। এসব ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক।
তবে কোনো কোনো কৃষক কষ্টের ধানকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। ধানকে ভিজিয়ে রাখছেন পানিতে। কেউ কেউ টিনের শেড কিংবা পাকা ঘরের মেঝেতে পালা করে শুকানোর চেষ্টা করছেন সোনার ফসল।
কৃষকেরা জানান, আগেকার দিনে এমন পরিস্থিতিতে ধানকে বস্তাবন্দি করে পুকুর, ডোবা কিংবা নদীর পানিতে ভিজিয়ে রাখতেন অনেকে। যাদের নৌকা ছিলো তাদের কেউ কেউ ধানকে বস্তাবন্দি না করে খোলা অবস্থায় নৌকায় ভরে নৌকা একটি নির্দিষ্ট, নিরাপদ ও সুবিধাজনক জায়গায় ডুবিয়ে রাখতেন। এ অবস্থায় অনেক (১৫/২০ দিন) দিন পর্যন্ত ধানে চারা গজাতো না। এখনও কেউ কেউ এমন পদ্ধতি গ্রহণ করছেন, যেনো ধানগুলো পুরোপুরি নষ্ট না হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেন। এ পদ্ধতিতে ধানের কোনো ক্ষতি না হলেও কৃষকের কষ্ট ও খরচ বেড়ে যায়। চালের গুণাগুণও কিছুটা কমে যায়। অবশ্য একথা মানতে রাজি নন প্রবীণ কৃষকেরা। তাঁরা বলেন, এতে তো ধানের ক্ষতি হবেই না বরং লাভ হবে।

চিন্তিত হাজারো কৃষক, অঙ্কুর ঠেকাতে ব্যবহার করছেন প্রাচীন পদ্ধতি


শান্তিগঞ্জের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের মাদ্রাসাপাড়ার প্রবীণ কৃষক খোয়াজ আলী বললেন, লাগাতার বৃষ্টি—বাদল হলে আগে আমরা ধান বস্তাবন্দি করে পুকুর, ডোবা অথবা নদীতে ভিজিয়ে রাখতাম। দিন না উঠা পর্যন্ত থান তুলতাম না। কষ্ট একটু বেশি হতো কিন্তু একটা ধানও নষ্ট হতো না। চালও খুব ভালো হতো। এখনও হবে। কোনো চাল নষ্ট হবে না।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা, জাহাঙ্গীরনগর, গৌরারং, লক্ষণশ্রী, মোল্লাপাড়া, কোরবাননগর, বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ, পলাশ শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের সলফ ও জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামসহ জেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা বস্তাবন্দি করে ধানকে পানিতে ভিজিয়ে রেখেছেন।
জামালগঞ্জের নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক মোমিন আহমদ বললেন, আমাদের গ্রামে অনেক কৃষক ধান ভিজিয়ে রেখেছেন। ধানে চারা গজিয়েছে। আর যেনো চারা না গজায় সে জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি বিজ্ঞানসম্মত কি না জানি না তবে অনেকটা কার্যকরী পদক্ষেপ। শান্তিগঞ্জের সলফ গ্রামের কৃষক মঞ্জুরুল ইসলামও একই ধরণের পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছেন।


এদিকে, এ পদ্ধতিকে বিজ্ঞান সম্মত নয় বলে জানিয়েছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, এ ব্যপারে আমি কিছু বলতে চাই না। তবে আমাদের পরিকল্পনা আছে ড্রায়ার মেশিন (ধান শুকানোর যন্ত্র বিশেষ) নিয়ে আসার। মেশিনটা একটু দামী। প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন কৃষকও যদি ভর্তুকির মাধ্যমে মেশিনটা নিয়ে আসেন, তাহলে হয়তো ওই ইউনিয়নের কৃষকেরা অনেকটা উপকৃত হতেন। এ বছর আর সময় নেই। আগামী বছরের প্রথম দিক থেকেই আমরা ওইদিকে মুভ করবো। এবছর বিকল্প কিছু দেখছি না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ—পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, ধান পানিতে ভিজিয়ে রাখলে চারা ওঠবে না। পানিতে তিন—চার দিনের বেশি রাখা যাবে না। পাকা ধান গাছে থাকলে কয়েকদিন রাখা যায়। পানিতে ভেজানো ধান পানি থেকে তোলার পর ছড়িয়ে দিয়ে দ্রুত শুকাতে হবে। তাহলে চালের পুষ্টিমান নষ্ট হবে না। তবে চালের উজ্জ্বলতা কমে যাবার আশংকা থাকে। উজ্জ্বলতা বাড়ানোর জন্য ধান ভাঙানোর সময় বেশি পরিস্কার করতে চাইলে পুষ্টিমান কমবে। তার দাবি ভেজা ধানের পরিমাণ খুব বেশি হবে না। গত সাত দিন ধরে বৃষ্টি হলেও মঙ্গল ও বুধবার বেশ সময় আবহাওয়া ধান শুকানোর উপযোগি ছিল।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিধ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বললেন, আগামী ২০ মে শুক্রবার দিনে আবহাওয়া ধান শুকানোর মতো থাকবে। এরপর ২৩, ২৪ ও ২৫ মে দিনে দিনে ধান শুকানো যাবে। এরপর ২৮ মে পর্যন্ত আবহাওয়া ধান শুকানোর অনুকুলে থাকবে না।