গোপন ভোটে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচন আশাব্যঞ্জক ঘটনা

দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কাউন্সিল বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিএনপি নেতা মীর্জা আব্বাসের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সনে সংগঠনটির সর্বশেষ সম্মেলন বা কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই কাউন্সিলে ইলিয়াস আলী ও রুহুল কবীর রিজভীকে সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়েছিল। দুঃখজনক বিষয় হলো কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত ওই কমিটিটি মাত্র তিন মাসের মাথায় ভেঙে দেয়া হয়। এর পর থেকে ২৮ বছর ধরে মনোনীত কমিটির মাধ্যমে এই ছাত্র সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছিল। বৃহস্পতিবারের কাউন্সিলে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে কাউন্সিলরগণ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেছেন। কাউন্সিলরদের গোপন ভোটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন যথাক্রমে ফজলুর রহমান খোকন ও ইকবাল হোসেন শ্যামল। সর্বস্তরের কাউন্সিলরদের ভোটে কোন বৃহৎ সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার এই ঘটনা রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংবাদ। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা সীমিত আকারে হলেও শুরু হলো, এই দিকটিই হলো আশাব্যঞ্জক।
রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতির কারণে সংগঠনের যেকোনো পর্যায়ের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে দলের সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের পরিবর্তে ব্যক্তি বিশেষের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা দেখা দেয়। এর ফলে যোগ্য ও ত্যাগী ব্যক্তিরা দলের ভিতরে যথাযথ মূল্যায়ন পান না বলে ব্যাপকভাবে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দলের ভিতরে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অভাবে নেতৃত্বের কেন্দ্রীভবন ঘটে থাকে এবং মূলত এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরই যাবতীয় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নির্ভরশীল হয়ে উঠে। এতে করে দলের ভিতরে গণতন্ত্রের পরিবর্তে এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রসার ঘটে যা পরে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়তে দেখা যায়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিত্ববান ও যোগ্য-মেধাবীরা এখন রাজনীতিকে এড়িয়ে চলতে ভালবাসেন। অথচ দেশ পরিচালনা ও শাসনের মূল দায়িত্বটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতেই। এখানে যদি মেধা ও যোগ্যতার ঘাটতি দেখা যায় তাহলে নিশ্চিতভাবেই দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও নানা সংকট তৈরি হয়। তাই সর্বদাই সব সাংগঠনিক স্তরে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন সমাজবিজ্ঞানীরা। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ভোটের ব্যবস্থা এই জায়গায় সবিশেষ গুরুত্ববহ। এই ঘটনা যদি ছাত্রদলের মূল দল বিএনপি সহ সকল অঙ্গসংগঠন এবং বাংলাদেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণ করে তাহলে এই দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী হতে দোষ নেই। কিন্তু আমরা ঘর পোড়া গরুর মতো সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই যে। গোপন ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্বই না আবার খুদে স্বৈরাচার হয়ে উঠেন এমন আশঙ্কা আমাদের ঘাড়ে ভর করে।
সংকট ও শূন্যতা যখন বিশাল আকার ধারণ করে তখন সুরঙের ভিতর এক চিলতে আলোও নৈরাশ্য কাটাতে সহায়তা করে। ছাত্রদলের কাউন্সিল, গোপন ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন আমাদের কাছে এক চিলতে আলোর সমতুল্য। আমরা চাই এই আলো সর্বত্র চড়িয়ে পড়–ক। একদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নিজের দলের ভিতরে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের নাম করে তৈরি হওয়া দুর্নীতির মহারাজাদের এক দুইজন করে ধরা খাচ্ছেন। আরও অনেকেই ধরা খাবেন বলে ব্যাপক আলোচনা আছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিচক্ষণ ও প্রশংসনীয় কর্মকা- অবশ্যই প্রচলিত দুর্নীতিগ্রস্ত ধারার রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গণস্বার্থের রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে আনবে। এর সাথে অন্যতম রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ভিতরে গণতান্ত্রিক চর্চার দৃষ্টান্তটিও একই সাথে রাজনীতির স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রটিকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বেগবান করলে সেটিও হবে আরেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শেষ কথা হলো রাজনীতিকে আমরা গণমানুষের প্রতিনিধিত্বশীল রূপে দেখতে চাই।
ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে অভিনন্দন।