গৌরবের গৌরবজনক ফলাফল- কলেজে ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা

বিন্দু তালুকদার
গৌরব দাস, বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামে। সে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় গ্রামের পাশের শান্তিগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এসএসসি পরীক্ষার পাশের হার কমলেও গ্রামের বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগ থেকেই জিপিএ-৫ পায় গৌরব দাস। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগছে সে।
পরিবারের একমাত্র উপর্জনশীল ব্যক্তি বাবা গোপাল দাস মিষ্টির দোকানে (শহরের দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার) কাজ করেন। অসুস্থ্য মা-স্ত্রী, স্কুল পড়–য়া তিন সন্তানের ভরণপোষণ ও লেখাপড়ার খরচ জোগাতে নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থা তাঁর।
তার ছোট ছেলে সেবক দাস শান্তিগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে ও মেয়ে মিতালী দাস গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে পড়ে। স্ত্রী শিল্পী দাস অসুস্থ্য, তিনি ডায়াবেটিসের রোগী। তাকে নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে হয়।
দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী গৌরব ২০১৫ সালে একই বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ সহ মেধাবৃত্তি পেয়েছিল। এরপর তার বাবা চেষ্টা করেছিলেন তাকে শহরের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর। সুযোগ হয়েছিল ভর্তির। সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফ্রি ভর্তির সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু শহরে থাকা-খাওয়া বা প্রতিদিন বাড়ি থেকে সিএনজি ও অটো রিকশা দিয়ে আসা-যাওয়ার সামর্থ না থাকায় শহরের নামি স্কুলে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় তার।
মেধাবী শিক্ষার্থী গৌরব দাসের ইচ্ছা ছিল সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়বে। কিন্তু বাড়ির কাছের বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় বাধ্য হয়েই মানবিক বিভাগে ভর্তি হয় সে।
তবে মেধাবী শিক্ষার্থী গৌরব দাসের পাশে দাঁিড়য়েছিল বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকগণ। বিনা বেতনে অধ্যয়ন ও বই, খাতা, কলম কেনার টাকাও দিয়েছেন পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি হারুন আল রশিদ ও অন্যরা। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সকল শিক্ষকগণ গৌরবকে সহযোগিতা করেছেন। সবার সহযোগিতায় গৌরব মানবিক বিভাগ থেকেই জিপিএ-৫ অর্জন করে বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
জিপিএ-৫ অর্জনকারী গৌরব সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়তে চায়। কিন্তু বাবার অর্থ না থাকায় কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা সেই অনিশ্চয়তা তার পিছু ছাড়ছে না ।
গৌরব দাস জানায়, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি, সকল শিক্ষক ও আত্মীয়-স্বজনরা সহযোগিতা না করলে তার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হত না।
গৌরব দাস বলে, ‘সবার সহযোগিতায় আমি ভাল ফলাফল অর্জন করেছি। ম্যানেজিং কমিটি, হেড স্যারসহ সকল স্যাররা আমাকে সহযোগিতা না করলে আমি পড়তে পারতাম না। আমি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়তে চাই। কিন্তু আমার বাবা যে টাকা বেতন পান সেই টাকা দিয়ে আমাদের সংসারই চলে না। আত্মীয়-স্বজনরা মাঝে মাঝে সহযোগিতা করেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা কিভাবে জোগাড় করব। ’
গৌরব দাসের দাদা (বাবার কাকা) কবিরঞ্জন দাস বলেন, ‘ নাতিটা ভাল ছাত্র ছিল। টাকা-পয়সা না থাকায় ভাল স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়নি। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি ও স্যাররা তাকে পড়াইছে। তার বাবা একা সংসার চালায়, খেয়ে না খেয়ে পরিবার চলে। পরিবারে তিনজন ছাত্র, তার মা ও বউ দুইজনই অসুস্থ্য। কলেজে ভর্তি হওয়ার এত টাকা কোথায় পাবে সে। সমাজের ধনী মানুষরা সহযোগিতা করলে তার লেখাপড়াটা নিয়মিত চলত।’
শান্তিগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সফিকুল ইসলাম সফিক বলেন,‘ গৌরব দাসের পরিবার হতদরিদ্র, তবে সে খুব মেধাবী ছাত্র। সে অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ ও মেধাবৃত্তি পেয়েছিল। মানবিক থেকেই জিপিএ-৫ অর্জন করে আমাদের বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমরা আশা করছি এসএসসিতেও মেধাবৃত্তি পাবে। সে আমাদের বিদ্যালয়ের এসএসসিতে প্রথম জিপিএ-৫ অর্জনকারী ছাত্র। আমরা সবাই তাকে সহযোগিতা করেছি। তার মেধা নষ্ট হতে দেয়া যায় না। তাকে কলেজে ভর্তি করতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। আমরা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও এলাকার গণ্যমান্যদের সাথে কথা বলছি কিভাবে টাকা সংগ্রহ করে তাকে কলেজে ভর্তি করানো যায়। ’