গৌরারং জমিদার বাড়িকে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর করার প্রস্তাব যুক্তিসঙ্গত

জমিদার বাড়ি। খুব সুখকর নাম নয়। এই নামের সাথে ইতিহাসের অনেক বেদনার কথা জড়িয়ে আছে। প্রজা পীড়নের স্তম্ভ ছিল এই জমিদার বাড়িগুলো। ইংরেজ প্রবর্তিত জমিদারি প্রথায় এলাকায় এলাকায় যে ক্ষুদ্র অধিপতি গোষ্ঠীর জন্ম হয় তাঁদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই ছিল নিজ জমিদারির অন্তর্গত প্রজাদের নানাভাবে উৎপীড়ন করার অভিযোগ। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে কৃষক ও প্রজা বিদ্রোহ হয়েছিল বিভিন্ন জনপদে। আমাদের এই অঞ্চলে শুধুমাত্র থাকার জায়গা দেয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে দিয়ে বেগাড় খাটানোর যে অমানবিক প্রথা, নানকার প্রথা নামে যা পরিচিত ছিল, তার বিরুদ্ধে নানকার প্রজাদের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল বিভিন্ন জমিদারিতে। এইসব প্রতিবাদ ও আন্দোলন সংগ্রামই মূলত মানুষের বিদ্রোহী সত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলে। কালক্রমে এই বিদ্রোহ জমিদারি প্রথার বাইরেও বৃহত্তর পরিসরে ধাবিত হয়। ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানি বিজাতীয় শাসক-শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন-সংগ্রাম, সবশেষে একাত্তরের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ; এর সবকিছুর পিছনেই ছিল অধিকারহারা মানুষের বিদ্রোহী সত্ত্বা। দুই শতক ধরে চলমান জমিদারি প্রথা তাই এই জনপদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হোক সেটি নিপীড়নমূলক অথবা জনস্বার্থ পরিপন্থী কতিপয় দাম্ভিক সামন্তপ্রভুর অন্যের রক্ত চুষে নিজের রঙমহল বানানোর ইতিহাস, তবু ইতিহাস তো বটে। ওই অংশ ছাড়া জনপদের ঐতিহাসিক পরিক্রমাকে এবং অতিঅবশ্যই সংগ্রামী মানুষের অগ্রগতির ধারাকে আত্মস্থ করা সম্ভব নয়। তাই যেমন সংগ্রামের বিদ্রোহের ঐতিহ্যের সকল ঐতিহাসিক উপকরণ সংগ্রহের অপরিহার্যতা প্রবল তেমনি জমিদারি প্রথার যত চিহ্ন রয়েছে সেগুলোও সমান যত্ন দিয়ে সংরক্ষণ করা জরুরি। অবশ্য জমিদারি প্রথার নির্মমতার বাইরেও এর কিছুটা জনহিতকর রূপেরও দেখা মিলে। বিভিন্ন শিক্ষা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার পিছনে কোন কোন জমিদারের অবদানকে কখনও খাটো করে দেখার উপায় নেই। জমিদারদের বিপুল পরিমাণ অত্যাচারী চেহারার সাথে ওই কল্যাণমুখী ক্ষুদ্র অংশের অবদানকে সম্মান জানানোও আরেক ঐতিহাসিক দায়।
প্রত্নত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আতাউর রহমান সম্প্রতি গৌরারং জমিদার বাড়ি সরেজমিন পরিদর্শন করে এই জায়গাটিতে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, সুনামগঞ্জ অঞ্চলের যত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে, ভবিষ্যতে আরও যা পাওয়া যাবে, তার সবকিছু নিয়ে গৌরারং জমিদার বাড়িতে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ বাস্তবানুগ এবং বিভিন্ন দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি গৌরারং জমিদার বাড়িতে এখনও জমিদারি আমলের কিছু অবকাঠামো রয়েছে যা সংস্কার করলে জাদুঘর হিসাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত গৌরারং জমিদার বাড়িটিও রক্ষা পাবে।
সুনামগঞ্জে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত। ইতোমধ্যে প্রাচীন লাউড় রাজ্যের রাজধানী বলে খ্যাত হলহলিয়া দুর্গ উৎখননের কাজ শুরু করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ওই খনন শুরু হওয়ার পর প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে অনেক প্রাচীন নিদর্শন পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। শুধু হলহলিয়া নয় তাহিরপুরের সীমান্ত সংলগ্ন বিস্তৃত অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে। জেলার জগন্নাথপুর উপজেলাতেও অনুরূপ সম্ভাবনা বিদ্যমান। কারণ জগন্নাথপুরের কোন অংশে একদা লাউড় রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী ছিল বলে কথিত। জাতীয় ইতিহাস জানার অভিপ্রায়ে সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রগুলোই একসময় উন্মাচিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আর এইসব নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান প্রয়োজন। যে স্থানটি যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামোগত দিক দিয়ে উপযুক্ত। জেলা শহরের একেবারে নিকটবর্তী এবং সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত গৌরারং জমিদার বাড়িটি সবদিক দিয়েই প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হওয়ার শর্ত পূরণ করে।