গ্যাং কালচার : সংঘাতে মত্ত কিশোররা

সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
গেলবছরের শুরুর দিকে ঢাকার উত্তরায় একদল কিশোরের গ্যাং গড়ে ওঠার খবর শোনা গেছিল। সাধারণত ছোটবেলায় স্কুলের বন্ধুরা যেভাবে দলবল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়, সেই বয়সেই তারা গ্যাং তৈরি করে ফেলেছে। বাইক নিয়ে ঘোরাঘুরি, ছুরি-চাকুর মত অস্ত্র সঙ্গে রাখা, কখনো মাদক গ্রহণ; এভাবে ধীরে ধীরে তাদের বেপরোয়া চলাফেরা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং আর সংঘাতের বলি হয় আদনান কবির নামের এক কিশোর, যে সবেমাত্র নবম শ্রেণিতে পড়ত। এই হত্যাকাণ্ডের পরই বিষয়টি নজরে আসে। অন্যদিকে, ফরিদপুরের এক কিশোর মা-বাবার কাছে মোটরসাইকেলের আবদার করেছিল। মোটরসাইকেল না পেয়ে মা-বাবার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় সে, মা বেঁচে গেলেও বাবা মারা যান। বছরের শেষদিকে ঢাকায় পাড়ার ‘জুনিয়র-সিনিয়র’ বিতর্কের কারণে হাসান নামের এক জেএসসি পরিক্ষার্থী তার এলাকার কয়েক কিশোরের হাতে ছুরিকাহত হয়। এই বছরের শুরুতে চট্টগ্রামের আরেক স্কুলছাত্র আদনান ইশরাফ খুন হয় কয়েকজন কিশোরের হাতে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় এক স্কুলছাত্রীর লাশ পাওয়া গেছে, বলা হচ্ছে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে; সেই হত্যাকা-ের দায় চেপেছে তার ‘প্রেমিক’ আদনান নামেরই আরেক কিশোরের ওপর। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান আদনানের সঙ্গে তার ফেসবুকে পরিচয়, তারপর ঘনিষ্টতা। সম্পর্কের খাতিরেই সমুদ্রপাড়ে বেড়াতে গিয়েছিল মেয়েটি। গণমাধ্যমের বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনা ঘটিয়েছে ‘রিচ কিড্স গ্রুপ’।
‘কিশোর’ মানেই প্রাণোচ্ছ্বল, সজীব। অন্যরকম উচ্ছ্বাসের বয়স। যেই সময়টায় মাঠে ব্যাটবল হাতে বা ফুটবল নিয়ে খেলতে যাবার বয়স, সেই বয়সেই এখন কিশোররা সংঘাতে জড়াচ্ছে। যে সময়টা ঘরে বসে গল্পের বই পড়ার, তখন তারা ব্যস্ত অনলাইনে- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর এই ব্যস্ততার ভেতরেই বিনোদন হিসেবে তারা খুঁজে নিচ্ছে নানা নেতিবাচক কর্মকা-ের উৎস। অন্যের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, পর্যায়ক্রমে জড়াচ্ছে নানারকম অপরাধমূলক কর্মকা-ে।
কৈশোরের উচ্ছ্বাস নিয়ে কবিসাহিত্যিকরা অসংখ্য কবিতা, গান আর গল্প লিখেছেন। ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা/ ওরে সবুজ ওরে অবুঝ/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙক্তিতে প্রকাশ পায় কিশোর-তরুণ কিংবা নবীনদের প্রতি আশার বাণী। কিন্তু এখন যখন প্রায় নিয়মিতই পত্রিকার পাতায় নানারকম ‘কিশোর অপরাধ’নিয়ে শিরোনাম হয়, তখন বারবার থমকে যেতে হয়।
৭ থেকে ১৬ বছর বয়সীদেরকে কিশোর বলা হয়। এই কিশোররা অপরাধমূলক কাজ করলে তাদের কিশোর অপরাধী বলে। একটা সময় ছিল, দরিদ্র পরিবারের অনেক কিশোররা অভাবের তাড়না থেকেই চুরি-ছিনতাইয়ের মত বিভিন্ন অপরাধে জড়াত। এখন এই অপরাধের ধরন বদলেছে। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও ঘটাচ্ছে নানা নেতিবাচক ঘটনা। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তারা অপরাধে জড়ায়। কিশোরদের ‘প্রেম’ আর ‘গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড’ সম্পর্ককে ছাপিয়ে ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনের মত ঘৃণ্য ঘটনা তো অহরহই ঘটে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিশোর বয়সে আবেগ বেশি থাকে। এইসময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা, টেলিভিশনের সিনেমা, সবকিছুই প্রভাবিত করে। ফলে অনেকের মধ্যে একরকম ‘হিরোইজম’ তৈরি হয়, আর এই হিরোইজম আর অপরিণত আবেগই তাদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করায়। যথেষ্ট সচেতনতা আর দেখভালের অভাব রয়েছে অভিভাবকদেরও।
দেশের দু’টি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে জানা যায়, সেখানে পুনর্বাসনে থাকা কিশোরদের ২৪ শতাংশ নারী নির্যাতনের মামলায় অভিযুক্ত। বেশিরভাগ অভিযোগ ধর্ষণের। ২০ শতাংশ কিশোর খুনের মামলার আসামি।
সামাজিক বিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও আকাশ সংস্কৃতি কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার অভাব রয়েছে। একেবারে অল্পবয়স্ক কিশোরও এখন মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যেখানে অভিভাবকরা সচেতনভাবে নজরদারি করেনা। নানারকম নেতিবাচক জিনিস দেখে তা থেকে প্রভাবিত হয়ে অনেকে বাস্তবে তা ঘটাচ্ছে।
যে ছেলেটি তার পাশের বাড়ির ছেলের হাতে দামী মোবাইলফোন দেখছে, সেটি দেখে তারও তারচেয়ে দামী কিছু কিনবার মনোভাব তৈরি হচ্ছে। মুঠোফোন, মোটরসাইকেল পাবার আবদার তো পুরনো ঘটনা। কিন্তু এখন এই আবদার পূরণ না হলে তারা হয়ে উঠছে আক্রমণাত্মক। বাবা-মা বন্ধুর বদলে শত্রু!
সিনেমায় দেখা যায়, নায়িকাকে পাবার জন্য নায়ক নানান কায়দায় বেপরোয়া আচরণ করতে থাকে। র ্যাগিং, ইভটিজিং, এমনকি কখনো কখনো কিডন্যাপ! সিনেমার ভেতরে অবশেষে প্রেম হয়। এই দৃশ্য যখন বাস্তবে একজন কিশোরকে প্রভাবিত করে তখন তার মধ্যেও সিনেমার হিরোর মত আচরণ তৈরি হতে থাকে। এরই প্রতিফলন ঘটে ইভটিজিংয়ে। প্রেম নিবেদনের এই বিকৃতরূপ যে নেতিবাচক, সেটা তখন বোঝানোর কেউ থাকেনা। সুতরাং এসব কিশোর অপরাধ থামাতে হলে প্রয়োজন সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা।
দেশে কিশোর অপরাধ সম্পর্কিত আইন আছে। আইনের ভাষ্য হল, অভিযুক্ত কিশোরের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করে তার মনোবৃত্তি সংশোধনের চেষ্টা করা। এ তো গেল অপরাধ করার পরের ধাপ। কিন্তু, কিশোর অপরাধ যেন না ঘটে- সে জন্য কী করতে হবে? প্রথম কথা, অভিভাবকদেরকে সচেতন হতে হবে। শিশু-কিশোরদের মাঝে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে হবে। পরিবারের সবাই মিলে ভাল চলচ্চিত্র দেখুন। গল্পের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে দিন। উদার, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করুন।
লেখক: ফিচার রিপোর্টার, দৈনিক ইত্তেফাক



আরো খবর