গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের প্রণোদনা দাবি কৃষক সংগ্রাম সমিতির

বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সভাপতি হাফিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান কবির এক যুক্ত বিবৃতিতে অবিলম্বে হাটে-হাটে ক্রয় কেন্দ্র খুলে কৃষকের নিকট থেকে মোট উৎপাদনের সিংহভাগ সরাসরি ধান ক্রয় ও আগামী ফলনের জন্য বিনাসুদে ঋণ, বীজ, সার, সেচ ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করার দাবী জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, এ বছর বোরো মৌমুসে ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে ২ কোটি ৪ লক্ষ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। মৌসুমে সরকার ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল, ধান ও গম ক্রয় করবে। আর বছরব্যাপী ধান-চাল মিলে ১৭ লাখ টন ক্রয় করবে, যা বোরো উৎপাদনের ৫-৬ ভাগ মাত্র। ধান ৬ লাখ এবং চাল ১১ লাখ টন কেনা হবে বলে জানা যায়। ভয়াবহ ভাইরাস করোনা মহামারীর সময়ে এই সংগ্রহ-লক্ষ্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। পুরো দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যেই সংগ্রহের পরিমাণ গত বছরের চেয়ে মাত্র ২ লাখ টন বাড়ানো হয়েছে যা হাস্যকর। নেতৃবৃন্দ মোট উৎপাদনের বৃহৎ অংশ সরাসরি কৃষকদের নিকট থেকে ক্রয়ের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কৃষক এখনও পর্যাপ্ত দাম পাচ্ছে না, অথচ কৃষিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। তার ওপর চালকল মালিক ও ব্যাপারীদের কারসাজিকে সিন্ডিকেট উল্লেখ করে একাধিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে চাল নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে অপেক্ষায় রয়েছে বেশ কিছু ট্রাক বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের অনুমতি মিললেই চালবোঝাই এসব ট্রাক প্রবেশ করবে বাংলাদেশে। কৃষকের ধান বিক্রির এ সময় চাল বিদেশ থেকে আসা ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’র মত। অন্যদিকে পেঁয়াজ বিক্রিতেও কৃষক দাম পাচ্ছে না, আবার পেঁয়াজও এখনই আমদানী করা হচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সবজি, তরিতরকারি, ফল-মূলের মূল্য নিয়ে কৃষক উদ্বিগ্ন। নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক এক ভার্চুয়াল সেশনে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড এম বিসলে বলেছেন, করোনার কারণে বিশ্বে বর্তমানে প্রতি রাতে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া ৮২ কোটি মানুষের সঙ্গে আরও ১৩ কোটি মানুষ যুক্ত হবে। এদিকে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের যৌথ উদ্যোগে গত বছর ১৫ জুলাই প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বে প্রতি নয়জনের একজন ক্ষুধায় ভুগছে। এমতাবস্থায় বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ তিন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চলমান করোনাভাইরাস সংকট সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য ‘খাদ্য ঘাটতি’ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে কোভিড-১৯-এর আগে স্বাস্থ্য পরিচর্যায় যখন ৮-১০ ট্রিলিয়ন খরচ হয়, তখন বৈশ্বিক সম্পদ ছিল ৩২০ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো। গড়ে স্বাস্থ্য খাতে খরচ ছিল সম্পদের ৩ ভাগ মাত্র। সম্পদ থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য ‘সকল সুখের মূল’ হিসেবে গুরুত্ব পায়নি। এমতাবস্থায় জনস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার কারণে কভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মহামারি চলছে। এ পর্যন্ত মারা গেছে ২ লক্ষ ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ আর আক্রান্তদের সংখ্যা প্রায় ৪৪ লাখ। সংক্রামিত ১৮৭ দেশের প্রায় সব দেশে জনসমাগম নিষিদ্ধ, বিমান চলাচল বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি, নাগরিকদের ঘরে আবদ্ধ রাখাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বার বার বলছে ভ্যাকসিন আবিষ্কার অনিশ্চিত। এমতাবস্থায় বাংলাদেশেও কোভিড-১৯-এর সংক্রমণে এ পর্যন্ত ২৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আজ পর্যন্ত সরকারি তথ্যমতে আক্রান্ত হয়েছে ১৮,৮৬৩ জন। এখানে পর্যাপ্ত পরীক্ষা না করার সমালোচনাও আছে। উপসর্গ নিয়ে এ যাবৎ প্রায় সহ¯্রাধিক লোক মারা গেছে বলে পত্র-পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারী সাধারণ ছুটিতে দেশ ‘শিথিল লকডাউন’ অবস্থায় চলছে যা আগামী ৩০ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে মূলত কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্সের ওপর। শেষের দু’টির অবস্থা বর্তমানে ভীষণ খারাপ। কৃষিতে সরকারের ভ্রান্তনীতি, সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনা কার্যকরী করা, নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রতিকূলতা আবহাওয়া মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হচ্ছে কৃষককে। জাতিকে ক্ষুধামুক্ত রাখতে এবং অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে কৃষক ও কৃষির অবদান অনস্বীকার্য। তাই অবিলম্বে কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।