গ্রাম বাঁচাতে কৃষিকে বাঁচাতে হবে

গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘গ্রাম ছাড়ছে মানুষ’। সংবাদটি পর্যবেক্ষণধর্মী। এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে দলে দলে মানুষ কেন গ্রাম ছাড়ছে। গ্রাম ছাড়ার বাস্তবতা নতুন না হলেও আগের গ্রাম ছাড়া আর এখনকার গ্রাম ছাড়ার মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। আগে পড়াশোনা বা উন্নত জীবন ধারণের জন্য সম্পন্ন ব্যক্তিরা শহরে এসে বসতি গাঁড়তেন। কিন্তু গ্রামের সাথে ছিল এদের নিবিড় যোগাযোগ। বলা যায় শহরবাসী এইসব সম্পন্নরা ছিলেন মূলত গ্রামেরই উপর নির্ভরশীল। গ্রামের কৃষিক্ষেত্র থেকে যা আয় হত তা দিয়েই এঁরা শহরে বসবাস করতেন। কিন্তু এখন মানুষ গ্রাম ছাড়ছে শিকড় ছিঁড়ে। গ্রামের সাথে সবধরনের সম্পর্ক চুকিয়ে এরা উন্মূল হচ্ছে। এই জন¯্রােতে এখন সম্পন্ন মানুষের চাইতে গরিব গ্রামবাসীর সংখ্যাই বেশি। আগে যারা কৃষি জমিতে শ্রম দিয়ে জীবিকা ধারণ করতেন এখন তাঁরা গ্রামে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের হদিস পাচ্ছেন না। গ্রামে শ্রমের দামও সস্তা। অসম্পন্ন পরিবারের এইসব পরিবারের নারী পুরুষ তাই ছুটে আসছে পার্শ্ববর্তী শহরে, কেউ যাচ্ছে দূরের শিল্পাঞ্চলে। বাংলাদেশের বিশাল গার্মেন্টস খাতের যে স্ফীত শ্রমশক্তি তা মূলত গ্রাম ছাড়া এই উন্মূল নারী পুরুষ। এর বাইরে কিছু শহরে এসে রিকসা চালায়, কেউ ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করে, কেউ দোকান কর্মচারির চাকুরি নেয়, বউ-ঝিরা ঠিকা বা স্থায়ী ঝি’র কাজ নেয়, কিছু শহরের শ্রমবাজারে শ্রম বিক্রি করতে ভোর বিহানে মোড়ে মোড়ে জটলা তৈরি করে। এইভাবে গ্রাম থেকে ক্রমাগত মানুষ কমছে। যারা শহুরে এই স্বচ্ছলতার হাতছানি উপেক্ষা করে বাপ-দাদার বসতভিটায় মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন, যারা পুরুষানুক্রমে শিখা ধান চাষ ও মাছ ধরার পেশার মায়া ছাড়তে পারেননি, এরাও এখন গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবছে। ভাবছে এই কারণে যে, হাড় ভাঙা খাটুনি দিয়ে তারা যে ফসল ফলায় তার উপযুক্ত মূল্য পায় না। গত কয়েক বছর ধরে ধানের বাজার দরের যে অবস্থা তাতে কেউ এখন ধান চাষে আগ্রহী নয়। গ্রামে থেকে যাওয়া এই শেষ মনুষ্যগোষ্ঠীটি যদি গ্রাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলার পল্লী প্রকৃতির যে রূপ আবহমান কাল থেকে আমাদের বেঁচে থাকার উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেটি একেবারেই ভেঙে যাবে। এই অবস্থা উন্নয়নের নাকি আরও তলিয়ে যাওয়ার উপখ্যান হবে ?
বাংলাদেশের প্রাণভোমরা হল গ্রাম, তা যে যত কথাই বলুন। গ্রাম ছাড়া বাংলাদেশ অচিন্তনীয়। এই দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থা এখনও গ্রাম কেন্দ্রিক- বিশেষ করে কৃষিনির্ভর। কৃষি না বাঁচলে বেলুনের মত ফুলে উঠা অপরাপর উন্নয়ন খাতগুলো চুপসে যেতে বাধ্য। মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ খাদ্য। এই খাদ্যের জোগানদাতা গ্রাম। কৃষকরা বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। ধানের পড়তি দরের কারণে যদি সত্যিই ধান চাষের অবস্থা পাটের ভাগ্য বরণ করে তা হলে যে মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে এই দেশ তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা নেই আর কোনো উৎপাদন-ব্যবস্থার। তাই গ্রামকেই বাঁচাতে হবে। গ্রামের মানুষকে গ্রামে থাকারই পরিবেশ করে দিতে হবে। সরকারের এখনকার জনপ্রিয় শ্লোগান হলো আমার গ্রাম আমার শহর। সরকারের সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল হলো এ শ্লোগান। সরকারও গ্রামকে বাঁচিয়ে রাখার চিন্তা করছে। এজন্য গ্রামের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে শহরের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দিতে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগ ,গ্রহণের মূলে থাকতে হবে গ্রামীণ জনপদের মানুষগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দান। গ্রামের উৎপাদিত দ্রব্য যাতে উপযুক্ত দামে বিক্রি করা যায় সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে সরকারকে। গ্রামে গ্রামে তৈরি করতে হবে কর্মসংস্থান। এরপর অন্যান্য অনুষঙ্গ, যথা-নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা।
আমাদের সবুজ প্রাণময় নির্মল গ্রামগুলো হাজারও মানুষের হাসি আর হুল্লোরে ভরে উঠুক এই আমাদের চাওয়া।