ঘরবন্দি সংস্কৃতি থেকে পথের সংস্কৃতি অনেক জনমুখী

নির্দিষ্ট সমাজের চেহারা প্রতিফলিত হয় তার সংস্কৃতিতে। সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের উপকরণই নয় বরং এর তাৎপর্য আরও অনেক বেশি গভীরে। এর শিকড় প্রোথিত আরও গহিনে। সংস্কৃতি যেমন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার পরিচিতি তেমনি ওই এলাকার অসংগতি-অন্যায্যতা-বঞ্চনা-ক্ষোভ ইত্যাদিরও প্রকাশমাধ্যম। সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সমাজ দেহ থেকে খারাপ যতো উপসর্গ সেগুলোকে বিদায় করে দিয়ে শুভ ও সুন্দরের উদ্বোধন ঘটানো। এই অর্থে সংস্কৃতি নির্মাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সমাজে যে গোষ্ঠীটি শক্তিশালী ও ক্ষমতাসীন থাকে তারা সংস্কৃতি চর্চার এই নির্মাতা চরিত্রটিকে পছন্দ করে না। তারা চায় সংস্কৃতি চর্চায় এমন কিছু যেন না থাকে যা সাধারণ মানুষকে কখনও প্রতিষ্ঠানবিরোধী করতে পারে। তারা সংস্কৃতিকে মধ্যবিত্ত ঘরানার শৌখিনতা ও বিনোদনের বাইরে গণমুখী চরিত্র ধারণ করতে দিতে চায় না। এর বাইরে সমাজের মূল স্রোতটি কিন্তু সংস্কৃতির এই নরম ঘরানার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করে গণমুখী সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে। মূলত ক্ষমতাসীন মহল ও সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি চর্চার এই যে দ্বৈরথ তার মধ্য দিয়েই আমাদের সংস্কৃতির ধারাটি আবর্তিত হয়। বলাবাহুল্য নদীর স্রোতকে যেমন আটকে রাখা সম্ভব হয় না, বাতাসের গতিপ্রবাহকে যেমন পালটানো যায় না তেমনি সংস্কৃতি চর্চায়ও বাধা দিয়ে একে একেবারে আটকে দেয়া কখনও সম্ভব হয় না। তাই আমরা দেখি ক্ষমতাধরদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই বাংলার গ্রামে-প্রান্তরে, শহরের পথে কিংবা শহীদ মিনারে গণমুখী সংস্কৃতি চর্চার ধারাটি ঠিকই কুল-কুল গুঞ্জনে অথবা মেঘের গুরুগম্ভীর নিনাদে ঠিকই অস্তিত্ববান হয়ে আছে।
আমাদের শহরে কিছু মিলনায়তনে মাঝে মধ্যেই বেশ কিছু সাংস্কৃতিক আয়োজনের দৃশ্য দেখি আমরা। এই সব আয়োজনের দর্শক-শ্রোতা ঘুরে ফিরে একই চেহারার ব্যক্তিবর্গ। এই চেহারাগুলোর বাইরে আর কেউ এসব অনুষ্ঠানের রসাস্বাদন করতে পারে না। তাই এইসব চর্চার উপযোগিতাও মূলত ওই গুটিকয়েক ব্যক্তির বাইরে কোন আলোড়ন তৈরি করে না। একে আমরা সহজেই ঘরবন্দি সংস্কৃতি বলতে পারি। ঘরবন্দি সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের সাংস্কৃতিক তথা মানবিক বোধের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন করতে চাইলে অবশ্যই সংস্কৃতিকে মুক্ত করে দিতে হবে সকলের মাঝে। সকলের মাঝে চর্চিত মুক্ত সংস্কৃতিই কেবল একটি মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে সক্ষম।
সম্প্রতি পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা লাগবে, এমন একটি গুজবতাড়িত ছিল সারা দেশ। এই গুজবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব নিয়মে কাজ করে চলেছে। গুজবে বিশ্বাস স্থাপন হলো মানুষের অন্ধত্বের বহিঃপ্রকাশ। এই অপবিশ্বাস ব্যক্তির সাংস্কৃতিগত নিম্নমানের পরিচায়ক। গণমুখী সংস্কৃতি দিয়ে মানুষের এই সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়ন ঘটানো যায়, একই সাথে গুজবের বিরুদ্ধে শক্তিশালী গণসচেতনতা তৈরি করা যায়। আমাদের শহরের বন্ধন থিয়েটার নামের একটি সংগঠন মঙ্গলবার দিনব্যাপী শহরের বিভিন্ন স্থানে গুজববিরোধী একটি পথনাটকের আয়োজন করে এই দায়িত্ব পালন করেছে। এর আগেও আমরা দেখেছি কৃষক যখন ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে নির্বাক, তখনও এই শহরের অন্য একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এই কৃষক হতাশাকে ধারণ করে পথনাটকের (ধান্যবাদ) প্রদর্শন করে। মূলত সংস্কৃতির ভিতরে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার এই যে অসম্ভব শক্তিশালী বিষয়টি রয়েছে তার বহুল প্রসার কাম্য। সংস্কৃতির এই শক্তিশালী দিক ব্যবহার করে আমরা সমাজ দেহ থেকে দূর করতে পারি বহু অন্যায্যতা ও কুসংস্কার। আমরা সংস্কৃতির এমন গণমুখী চরিত্রের ব্যাপক উত্থান কামনা করি।