ঘাটে ঘাটে সিণ্ডিকেট করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকারের পাশপাশি সারাদেশের স্বেচ্ছাসেবী, মানবিক মানুষ ও বিত্তশালীরা দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের ত্রাণের গাড়ি প্রবেশ করছে জেলা শহরে। তবে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পরিবহনের জন্য নৌকার ভাড়া চাওয়া হচ্ছে তিন থেকে চার গুণ বেশি। একারণে নিরুৎসাহিত হয়ে ত্রাণ বিতরণকারীরা আশেপাশের সুবিধাজনক জায়গায় ত্রাণ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। ত্রাণের সুষম বণ্টন না হওয়ায় সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার অসহায় লাখো মানুষ। এই বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারী ও সমন্বয় থাকা জরুরি বলেছেন স্থানীয়রা।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গেল গত ১৬ জুন সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকা বন্যা কবলিত হয়। বৃহস্পতিবার ভোর তিনটায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যায় জেলার ৮০ ভাগেরও বেশি এলাকা। গুরুত্বপূর্ণ অফিস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের তালা ভেঙে জীবন বাঁচিয়েছেন লাখো মানুষ। ভয়াবহ বন্যার তা-বে ঘরে থাকা ধানচাল, গহপালিত পশু, জমিতে থাকা সবজী, পুকুরের মাছ সবই ভেসে গেছে। এখনো হাজারো মানুষের ঘরে খাবার নেই, বাইরে কাজ নেই, উঁচু এলাকা থেকে পানি কমলেও নিচু এলাকা বন্যা কবলিত। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে প্রশাসনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে সুনামগঞ্জ এসেছেন অনেকে। ত্রাণ কর্মীরা জেলা শহরে এসে বিপাকে পড়েছেন।
ট্রলার চালক ও মালিকরা সি-িকেট করে অতিরিক্ত ভাড়া হাকাচ্ছে দূর থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক মানুষদের কাছে। অনেক নৌ সংগঠনের নাম দিয়ে ফেসবুকেও ফ্রি সার্ভিস দেবে বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া মিলছে না।
রাঙ্গামাটির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আর্ত সারথি’র সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণ কুমার কর্মকার বললেন, সুনামগঞ্জের বানভাসি মানুষের জন্য আমাদের সংগঠন থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ত্রাণ নিয়ে এসেছিলাম। ফেসবুকে দেখলাম তেল ও চালকের খরচ দিয়ে নৌকার ব্যবস্থা করেছে একটি নৌ সংগঠন। তাদের সঙ্গে তিন দিন যোগাযোগ করলাম, পরে জানানোর কথা বললো তারা, পরে আর জানায় নি। শেষ মুহূর্তে এসে আর ফোন ধরে নি। সহায়তার নামে সংঠগনের নাম প্রচারের প্রতারণা করছে তারা । এতে আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ছায়াতলের সংগঠক শহীদুর ইসলাম রাজু বললেন, কেরানীগঞ্জের বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ২১ তারিখ এক ট্রাক ত্রাণ নিয়ে সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়ার সাহেববাড়ির ঘাটে আসি। বিশ^ম্ভরপুর যাওয়ার জন্য একটি নৌকা ভাড়া নিতে চাচ্ছিলাম। নৌকায় আমাদের জ¦ালানি দেয়াসহ ভাড়া ছেয়েছে ৪০ হাজার টাকা। পরে কম ভাড়ায় আরেকটি নৌকাকে ঠিক করি। কিছুক্ষণ পরে সে নৌকাও যাবে না বলে জানায়। পরে আমরা বাধ্য হয়েই শহরের একটি হোটেলে অবস্থান করে আশেপাশের এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম চালাই। নৌকা চালকদের সিন্ডিকেটের কাছে নিজেদের অসহায় মনে হয়েছে। খুব বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরছি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. সোহানা আহমেদ বললেন, সুনামগঞ্জের বানভাসি মানুষদের জন্য প্রচুর ত্রাণ যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছেন তারা ত্রাণ পাচ্ছেন না। আবার অনেকে কয়েকবার করে পাচ্ছেন। প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলেরা মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই এরকম হচ্ছে। ত্রাণের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। ইউনিয়ন, পৌরসভায় নাগরিকদের তালিকা রয়েছে। এই তালিকা ধরেই ত্রাণ পৌছে দেয়া হোক।
তেঘরিয়া ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল কাদির শান্তি মিয়া বললেন, তেঘরিয়া ট্রলারঘাটে এখন আর স্থানীয় কোন ট্রলার নেই। এজন্য আমাদের সংগঠনও সক্রিয় নয়। এই ঘাটে এখন ঢাকার পর্যটনবাহী নৌ সার্ভিসই বেশি। কয়েকটি ট্রলার অন্যান্য ঘাটের কয়েকদিন ধরে এখানে এসে ভাড়ায় চলছে। এরা ত্রাণ নিয়ে আসা স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং প্রতারণাও করছে। মঙ্গলবার এক ট্রলার চালক স্থানীয় আরেক দালালের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা ভাড়া স্বাব্যস্ত করে টাকা লেনদেন করে। পরে দালাল পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে সরে গেছে। ট্রলার চালক এক পর্যায়ে যেতে পারবে না জানানোয়, বেকায়দায় পড়েন স্বেচ্ছাসেবী ত্রাণকর্মীরা। আমি ওখানে থাকায় ধমক দিয়ে পরে ত্রাণকর্মীদের ওই নৌকায়ই তুলে দেই। এরকম অবস্থা মোকাবেলার জন্য এই সময়ে রিভারভিউ থেকে ওয়েজখালী পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে পুলিশ মোতায়েন না করলে মানবিক মানুষেরা ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে ফিরবেন। এসব কথা ছড়িয়ে পড়লে ত্রাণ নিয়ে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন মানবিক মানুষেরা। এই বিষয়ে সমন্বয় জরুরি।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বললেন, জেলার কোন নৌ-ঘাটে ত্রাণ বিতরণ করতে আসা মানবিক মানুষদের কাছে কেউ বেশি ভাড়া চাইলে, পাশর্^বর্তী থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। তাতেও সহযোগিতা দেবার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে, আমার সঙ্গে অর্থাৎ এসপির ফোন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণে সহযোগিতা দেব। ত্রাণ বিতরণ করতে এসে কেউ হয়রানির শিকার হলে, অভিযোগ পাবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।