ঘুরে ফিরে তারাই পিআইসিতে

স্টাফ রিপোর্টার
হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী জমির পাশের কৃষক ও প্রকৃত কৃষকদের দিয়েই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনের নির্দেশনা ছিল।
গত বছর বাঁধ ভেঙে হাওরের বোরো ফসলহানির পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও অনেক পিআইসির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান-ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের হয়েছিল।
স্থানীয়ভাবে কৃষকসহ নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছিল ইউপি চেয়ারম্যান-ইউপি সদস্যদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র প্রকৃত কৃষকদের দিয়েই পিআইসি গঠন করতে।
কিন্তু নানা কৌশলে চলতি বছরও অনেক পিআইসির সভাপতি হয়েছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা (মেম্বারগণ)। পিআইসির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নাম এতদিন প্রকাশ্যে না আসায় সাধারণ কৃষকরা জানতে পারেনি কারা হয়েছেন পিআইসির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
সম্প্রতি বিভিন্ন প্রকল্পের পিআইসির সভাপতির নাম প্রকাশ হওয়ায় ঘুরে ফিরে চেয়ারম্যান-মেম্বাররাই পিআইসির দায়িত্ব পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে ব্যতিক্রম জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা। এই উপজেলার কোন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার কোনও পিআইসির সাথে জড়িত নন বলে জানা গেছে। তবে ওই এলাকার    
ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যগণ ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ তদারকি করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সদর উপজেলার খরচা ও জোয়াল ভাঙা হাওরের বাঁধ নির্মাণ কাজের পিআইসির সভাপতি হয়েছেন গৌরারং ইউপির ইউপি সদস্য মমিন মিয়া (পিআইসি নং- ৩৭), আইয়ুব আলী (পিআইসি নং- ৩৯), আয়না মিয়া (পিআইসি নং-৩৯), রবিউল আউয়াল ফকির (পিআইসি নং-৪০) ও মজিবুর রহমান (পিআইসি নং-৪৫)। এছাড়া ইউপি সদস্য জাহানারা বেগম আরেকটি পিআইসির সদস্য হিসেবে আছেন বলে জানা গেছে।
মোল্লাপাড়া ইউপির ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রেজুয়ান আলী রায়হান দরিয়া গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের বাঁধের পিআইসির সভাপতি।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে পৃথক পৃথক প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি হয়েছেন জয়কলস ইউপির সদস্য আনোয়ার হোসেন (সাংহই হাওরের পিআইসি নং-৭), ইউপির সদস্য মুহিবুর রহমান (সাংহই হাওরের পিআইসি নং-২৪), ইউপি সদস্য আশরাফ আলী (দেখার হাওরের পিআইসি নং-২৪) ও ইউপি সদস্য সুজন চন্দ্র তালুকদার (খাই হাওরের পিআইসি নং-২৮)।
দরগাপাশার ইউপি সদস্য বদরুল আলম (খাই হাওরের পিআইসি নং-১৪), ইউপি সদস্য জামিল আহমদ পায়েল (খাই হাওরের পিআইসি নং-১৫),  ইউপি সদস্য আব্দুল হক (খামখলা হাওরের পিআইসি নং-১১),ইউপি সদস্যা কবিতা দাস (কাছিরভাঙা হাওরের পিআইসি নং-১), ইউপি সদস্য আবুল হোসেন (জামখলা হাওরের পিআইসি নং-২), ইউপি সদস্য আবুল হাসান (জামখলা হাওরের পিআইসি নং-৩), ইউপি সদস্য ফারুক আহমদ (জামখলা হাওরের পিআইসি নং-৩),ইউপি সদস্য সিরিয়া বেগম (জামখলা হাওরের পিআইসি নং-৮)।
পাথারিয়া ইউপি সদস্য খাইরুন নেচ্ছা ( সাংহাই হাওরের পিআইসি নং-১৪), ইউপি সদস্য ইলিয়াছ মিয়া (সাংহাই হাওরের পিআইসি নং-৪) ও
ইউপি সদস্য রুশন আলী (সাংহাই হাওরের পিআইসি নং-২৩)।
পূর্ব পাগলা ইউপি সদস্য মকবুলনেচ্ছা (দেখার হাওরের পিআইসি নং-২৭), ইউপি সদস্য আফরুজা বেগম (দেখার হাওরের পিআইসি নং-৩০), ইউপি সদস্য কুহিনুর বেগম (দেখার হাওরের পিআইসি নং-৩২), ইউপি সদস্য কামাল মিয়া (দেখার হাওরের পিআইসি নং-৩৩), ইউপি সদস্য এহিয়া আহমদ সুমন (কাছির ভাঙা হাওরের পিআইসি নং-৯), ইউপি সদস্য আব্দাল মিয়া (কাছির ভাঙা হাওরের পিআইসি নং-১১), ইউপি সদস্য আজির উদ্দিন (দেখার হাওরের পিআইসি নং-১২), ইউপি সদস্য রুপন মিয়া (দেখার হাওরের পিআইসি নং-১৩), পশ্চিম পাগলা ইউপি সদস্য আলী আহমদ (দেখার হাওর-২ এর পিআইসি নং ২০)।
পূর্ব বীরগাঁও ইউপি সদস্য সিরাজুন বেগম ( জামখলা হাওরের পিআইসি নং-১০), ইউপি সদস্য ময়না মিয়া (খাই হাওরের পিআইসি নং-৪৫), ইউপি সদস্য দিদারুল হক দিদার (খাই হাওরের পিআইসি নং-৪৬), ইউপি সদস্য আবুল খয়ের ( খাই হাওরের পিআইসি নং-৪৭), ইউপি সদস্য জুবায়েল আহমদ (খাই হাওরের পিআইসি নং-৪৮) ও ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান ( খাই হাওরের পিআইসি নং-৪৯)।
পশ্চিম বীরগাঁও ইউপি সদস্য ইকবাল হোসেন (খাই হাওরের পিআইসি নং-১৫), ইউপি সদস্য তারা মিয়া (সাংহাই হাওরের পিআইসি নং-০৬), ইউপি সদস্য হারুন মিয়া (সাংহাই হাওরের পিআইসি নং-৩৪), ইউপি সদস্য আমিরুল ইসলাম (খাই হাওরের পিআইসি নং-৪৩), ইউপি সদস্য সাইদুল ইসলাম (খাই হাওরের পিআইসি নং-১৩)।
জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউপির পাগনার হাওরের বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি হয়েছেন ফেনারবাঁক ইউপির সদস্য আসাদ মিয়া, দিপক তালুকদার, রফিকুল ইসলাম রানা, আলী আহমদ, কেএম রহিম, ইয়াছিন মিয়া, মোশরাফ মিয়া ও অজিত সরকার। এই হাওরের একটি প্রকল্পের পিআইসি সভাপতি জামালগঞ্জ সদর ইউপি সদস্য গোলাম হোসেন।  
হালির হাওরের পৃথক ৪টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি হয়েছেন বেহেলী ইউপি সদস্য পিকলু পুরকায়স্থ, খোকন মিয়া, মনেছা বেগম ও মশিউর রহমান। একই হাওরের পৃথক ২টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রজব আলী ও প্যানেল চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান।
ভীমখালী ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল মিয়া ও সাচনাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীমও নিজ নিজ এলাকার পৃথক দুইটি ফসলরক্ষা বাঁধের পিআইসি সভাপতি বলে জানা গেছে।  
তাহিরপুরের বালিজুরী ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া ও ওয়াহিদ মিয়া শনির হাওরের পৃথক ২টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি। তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বুরহান উদ্দিন, ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া, ও হুমায়ুন কবির শনির হাওরের পৃথক ৩টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি, একই পরিষদের ইউপি সদস্য কামাল হোসেন মাটিয়ান হাওরের ১টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি।  
শ্রীপুর দক্ষিণ ইউপি সদস্য মিয়া হোসেন ও গোলাম সরোয়ার ডালিম শনির হাওরের পৃথক ২টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি। বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহার আলী মাটিয়ান হাওরের একটি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান, ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সানু মিয়া, ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নিকুঞ্জ দাস, ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নিরেশ দাস ও ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সাজু মিয়া ছায়ার হাওরের পৃথক ৫টি পিআইসির সভাপতি।
বাহারা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ব্রজলাল দাস, ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লিপটন দাস, ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সজল চৌধুরী ও ৬ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রদীপ দাস ছায়ার হাওরের পৃথক ৪টি পিআইসির সভাপতি, একই ইউপির ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নিতাই দাস ও ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নরেশ অধিকারী কুশিয়ারী নদীর ডান তীর রক্ষা ১টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি।
হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য টিপু সুলতান উদগল হাওরের ১টি পিআইসির সভাপতি, ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বিশ্বজিৎ দাস ও ৬ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শুতলাল দাস ভান্দা বিল হাওরের পৃথক ২টি পিআইসির সভাপতি, ৭ নং ওয়ার্ডের সবুজ মিয়া বরাম হাওরে ১টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি , ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইলিয়াছ মিয়া ও ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লাল মিয়া কুশিয়ারী নদীর ডান তীর রক্ষা ২টি পৃথক প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি।
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোশাহিদ মিয়া, ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হরিচরন দাস ও ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল কালাম কালিকুটা হাওরের পৃথক ৩টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি, ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছায়ার হাওরে ১টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি।
দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গেদু মিয়া দেখার হাওরের ১টি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি। সুরমা ইউপির সদস্য আব্দুল কাদির কাংলার হাওরের একটি পিআইসির সভাপতি ও একই পরিষদের সদস্য আলী নূর সদস্য।
মান্নারগাঁও ইউপি সদস্য অজিত চন্দ্র দাস ও ইউপি সদস্য আকিকুর রহমান দেখার হাওরের পৃথক দুইটি পিআইসির সভাপতি। দোহালিয়া ইউপি সদস্য আফিজ আলী দেখার হাওরের একটি পিআইসির সভাপতি ও ইউপি সদস্য সুলতান আলী একই প্রকল্পের সদস্য সচিব, ইউপি সদস্য আবুল কালাম একই হাওরের অন্য ১টি পিআইসির সভাপতি।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দেখার হাওরপাড়ের আস্তমা গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, ‘উতারিয়া বাঁধের পাশের অধিকাংশ জমি আমাদের। পিআইসি গঠনের কোন মিটিং হয়েছে বলে শুনিনি। পিআইসির ব্যাপারে আমাদের কোন কিছু জানানো হয়নি। প্রকৃত কৃষষদের বাদ দিয়ে মেম্বারকে পিআইসির সভাপতি করা হয়েছে। মেম্বাররা নিজেরাই পিআইসির সভাপতি হয়ে গেছেন।  ’
ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের পিআইসির সভাপতি হওয়া প্রসঙ্গে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ‘নতুন নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধের কাছের প্রকৃত কৃষকরা পিআইসির অন্তর্ভুক্ত হবেন। পিআইসি গঠন করেছেন উপজেলা কমিটি। উপজেলা কমিটি ভাল বলতে পারবেন কিভাবে তারা কমিটি গঠন করেছেন এবং কমিটিতে তাঁরা কাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ’