ঘুষ দেওয়ার অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নিলেন শিক্ষক নেতারা

ধর্মপাশা প্রতিনিধি
ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ১৩ তম গ্রেড প্রাপ্তির বকেয়া বেতন দ্রুত উত্তোলনের কথা বলে একটি চক্র লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নিজামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চ.দা.) আনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে গাছতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চ.দা.) এমদাদুল হক বকুল, বেখইজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম ও কামিয়াম খলাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর নূর এ চক্র পরিচালনা করেছেন। বকেয়া বেতন উত্তোলনে বিভিন্ন দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিদের ম্যানেজ করার কথা বলে সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ চক্রটি। কেউ টাকা না দিতে চাইলে তাকে শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে হেনস্থা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় ১৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮৭৩ (জাতীয়করণসহ) জন সহকারী শিক্ষক রয়েছেন। ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষকেরা ১৫ তম গ্রেড থেকে ১৩ তম গ্রেডে উন্নীত হন। এদের মধ্যে ৫৯৯ জন সহকারী শিক্ষকের ১৫ থেকে ১৬ মাসের উন্নীত স্কেলের বেতন ৮০ লাখ টাকা বকেয়া থেকে যায়। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম, এমদাদুল হক বকুল, সিরাজুল ইসলাম ও আব্দুর নূর একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন। সহকারী শিক্ষকদের নিয়ে এ ব্যাপারে জরুরি সভা করে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের অন্তত ৩৩ জন শিক্ষককে গ্রেড প্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা বকেয়া বেতনের পরিমাণ অনুযায়ী অধিকাংশ শিক্ষকের কাছ থেকে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা করে উত্তোলন করেন এবং নেতৃত্বধানকারী শিক্ষকদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু গেল ১৪ জুনের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। তখন গ্রেড প্রাপ্ত শিক্ষকদের টনক নড়ে। ফলে সহকারী শিক্ষকদের চাপে গত সপ্তাহে ওই চক্রটি টাকা উত্তোলনকারী শিক্ষকদের নিয়ে জরুরি সভা করে। ওই সভায় চক্রের সদস্যরা জানায় ইতোমধ্যে হিসাবরক্ষণ অফিসসহ বিভিন্ন খাতে টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু কোন খাতে কত টকা খরচ হয়েছে তা স্পষ্ট বলতে না পারায় উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে জোর করে টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা দিতে না চাইলে বিল আটকে দেওয়াসহ শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে হেনস্থা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বিল ছাড়ের জন্য হিসাবরক্ষণ অফিসে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।’
কিন্তু ধর্মপাশা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোক্তাদির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের টাকা দেওয়া হয়েছে এমন কথা সত্য নয়। আর কেউ যদি এমন মিথ্যা ছড়িয়ে আমাদের বদনাম করে তাহলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের বিদ্যালয়গুলো থেকে টাকা উত্তোলনে দায়িত্বে থাকা বেরিকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চ.দা.) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সহকারী শিক্ষকদের মুরুব্বী আনোয়ারুল ইসলাম এর (টাকা উত্তোলন) মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সাথে এমদাদুল হক বকুল, সিরাজুল ইসলাম ও আব্দুর নূরও আছেন। কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা উত্তোলন করিনি। আবেদনপত্র লিখতে ও প্রিন্ট করতে গিয়ে যা খরচ হয়েছে তা তোলা হয়েছে।’
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতা করছেন জানিয়ে প্রধান অভিযুক্ত আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘কারও কাছ থেকে কোনো টাকা উত্তোলন করা হয়নি। বিল কীভাবে হবে- না হবে এ ব্যাপারে মিটিং হয়েছে। কাগজপত্র মেইটেইন শিক্ষা অফিস করেছে। বিল করার দায়িত্বতো সম্পূর্ণ শিক্ষা অফিস ও হিসাবরক্ষণ অফিসের। আমি শুধু তাগিদ দিয়েছি।’
অভিযুক্ত আব্দুর নূর বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছাশ্রমে শিক্ষকদের জন্য কাজ করেছি। টাকা উঠিয়ে ভাগ করে নিবে এমন সিদ্ধান্তে আমি ছিলাম না। কেউ যদি বলে আমার কাছে টাকা দিয়েছে তাহলে আমি তার টাকা ফেরত দেবো।’ আর এমদাদুল হক বকুল তাঁর আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মানবেন্দ্র দাস বলেন, ‘বিষয়টি কেউ আমাকে জানায়নি।’
আর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম আব্দুর রহমান বলেন, ‘যারা এ কাজ করেছে তারা দালাল প্রকৃতির। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’