চরম দুর্ভোগে কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি
জেলার সবকটি হাওর পাড়ের কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। কৃষকরা বলেছেন, গত কয়েক বছর ধরে এমন দুর্ভোগে পড়েননি তারা। জেলার ১১ উপজেলার ১৩৮ টি ছোট-বড় হাওরের সব কয়টির ফসলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোন হাওর পুরোপুরি ডুবেছে, কোনটি অর্ধেক, অনেকগুলো ডুবেছে আংশিক । হয় বাঁধ ভেঙে, না হয় জলাবদ্ধতায়, আবার কোন কোন হাওরের ফসল নষ্ট হয়েছে শিলাবৃষ্টিতে।
জেলার বৃহৎ হাওরগুলোর মধ্যে তাহিরপুর ও জামালগঞ্জের শনির হাওর, দিরাই-শাল্লার বরাম হাওর, দিরাই উপজেলার চাপতির হাওর, ধর্মপাশার চন্দ্র সোনার তাল হাওর ও জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর ডুবেছে বাঁধ ভেঙে। সর্ববৃহৎ দেখার হাওরের নিচু এলাকার জমি বাঁধ ভেঙে ও জলাবদ্ধতায় ডুবেছে। দেখার হাওর পাড়ের কৃষকরা জানিয়েছেন হাওরের অর্ধেকের বেশী ধান কেটে আনার চিন্তা বাদ দিয়ে যেসব জমিতে ধানের গলায় গলায় পানি সেগুলো কেটে আনার চেষ্টা করছেন তারা।
হাওরপাড়ের সাদকপুর গ্রামের কৃষক যীশু দাস বলেন, ‘দেখার হাওর এবং আশপাশের ছোট ছোট কয়েকটি হাওর মিলে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমি আছে, এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির ধান কেটে আনার চিন্তা বাদ দিয়ে দিয়েছেন কৃষকরা। অন্য ধানের মধ্যে যেগুলোর গলায় গলায় পানি, সেগুলো কেটে আনার চেষ্টা হচ্ছে’।
একই গ্রামের অতীন্দ্র দাস বলেন,‘ধানের গলায় গলায় পানি, ধান কাটার শ্রমিকও নেই, ভাগে কেউ ধান কাটে না, ৫ থেকে ৬’শ টাকা রোজ ছাড়া মানুষ পাওয়া যায় না। যে ধান কেটে আনবে, এই ধানের অর্ধেক কাঁচা, এসব ধান কেটে আনলে শ্রমিকের খরচই উঠবে না’। একই গ্রামের আফাজ উদ্দিন একজন বর্গাচাষী। বললেন,‘৯ কেয়ার জমি বর্গা করেছিলাম, ৪ কেয়ার জমির আধা কাঁচা  কেটেছি, বাকী জমি ডুবে গেছে, এসব জমির ধান কাটার উপায় নেই’।
সাদকপুরের কৃষক কবির মিয়া বলেন,‘দেখার হাওরের তেলিখাল বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে, না হয় জলাবদ্ধতায় এতোটা ডুবতো না’। তিনি জানান, তেলিখাল বাঁধ পাউবো’র দেওয়া নয়। এলাকাবাসীর উদ্যোগে দেওয়া হয়েছে। এটি ছোট বাঁধ হলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ. পাউবো এই বাঁধে কাজ করে না’।
কৃষক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত জেলা সিপিবির’র সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘হাওরে এখন যে পানি হয়, এমন পানি এর আগে হয়নি তা নয়, আগেও হওয়ার রেকর্ড আছে, তবে আগে হাওরের পানি ধারণ ক্ষমতা ছিল, এখন তা নেই। হাওর এবং হাওরাঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে হলে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে নদী খনন করতে হবে, নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল খনন করতে হবে, হাওরের খাল-বিল খনন করতে হবে। সর্বোপরি লুটপাট বন্ধ করে স্বচ্ছতার সঙ্গে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। যেখানে ক্লোজার দেওয়া প্রয়োজন, সেখানে রাবারড্যাম করতে হবে, তাহলে ২৫ বছরের জন্য হাওর নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে’।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য মতিউর রহমান বুধবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘পাউবো’র দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে এ বছর অল্প বন্যায় হাওরের বাধ ভেঙে বোরো ফসলের বেশি ক্ষতি হয়েছে। ফসল রক্ষা বাঁধে বেশি অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে বাঁধের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। এবার হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ হয়েছে ৫০ ভাগ। সরকার পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেবার পরও পাউবো’র কর্মকর্তারা দুর্নীতি করেছে এবার বেশি। পাউবো, ঠিকাদার ও পিআইসির অবহেলার কারণে কৃষকরা তাদের কষ্টের ফসল ঘরে তোলতে পারেন নি। পাউবোর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সাথে ঠিকাদার ও পিআইসিরা জড়িত আছেন। এইসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ।’
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিন বলেন,‘ডুবন্ত বাঁধের বিপদ সীমার উপর দিয়ে যাচ্ছে পানি। ডুবন্ত বাঁধের বিপদসীমা ৫.৫ সে.মিটার। অথচ. হাওরের নদ-নদীর পানি ৬.৪৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে যাচ্ছে। একটি ভালো হাওর রক্ষা বাঁধ ১৩ তারিখের ভূমিকম্পে ধ্বস নেমেছে। জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর জলাবদ্ধতায় ডুবেছে। এই সময়ে এতো পানি হবে, এমন চিন্তা আমরাও করিনি, কৃষকরাও করেনি। কৃষকরা অপ্রস্তুত ছিলেন, তড়িঘড়ি করে এখন শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না, এ কারণে ক্ষতি হচ্ছে বেশী’। বাঁধ রক্ষায় স্থানীয়ভাবে এবং সিলেট-ঢাকা থেকেও বস্তা এনে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে দাবি করলেন আফছার উদ্দিন।