চরম নাব্যতা সংকটে পুরাতন সুরমা, খননের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

বিন্দু তালুকদার
পলি পড়ে ভরাট হয়ে পুরাতন সুরমা নদীর হারিয়ে যাওয়া স্রোত ফেরাতে নানান দাবি ও মতামত দিয়েছেন নদীর দুই তীরের বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি পুরো নদী খনন করা সম্ভব না হলে সরু করে হলেও খনন করা প্রয়োজন। এতে পানি প্রবাহ চলমান থাকবে। নদী তীরের লোকজন নিজেদের প্রয়োজনে ছোট নৌকা ব্যবহার করবে।
এছাড়া এই নদীর গতি ফেরাতে নানা পরামর্শ ও মতামত দিয়েছেন, নদী সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন উপচার্য অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত।
তবে স্থানীয়দের অনেকেই নদীর সাথে সংযুক্ত সকল খাল খনন করে হাওরের সাথে সংযোগ স্থাপনের দাবি জানান। তাদের দাবি নদীর পানি খালে প্রবাহিত হলে নদীর উপর চাপ কমবে ও নদীর পানি খাল দিয়ে প্রবাহিত হলে হাওরের জমিতে পলি পড়বে। পলি মাটিতে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। নদী ও হাওরের সংযোগ থাকলে হাওরের জলাশয়গুলোতে মাছের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। তাই নদী খননের পাশাপাশি নদীর সাথে সকল খালকে উদ্ধার করে খনন করতে হবে। খালের উপর কালভার্ট বা সেতু নির্মাণ করে পানি প্রবাহ ধরে রাখতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন,‘ বর্তমান সরকার সারা দেশের ৫ হাজার নদী-খাল খননের জন্য একটি অন্যতম বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জের ১২টি নদী-খান খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সুনামগঞ্জের প্রতি উপজেলায় ১টি করে, সদরে ২টি। এছাড়া ভরাটকৃত পুরাতন সুরমা নদীও খননের জন্য পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেলক্ষ্যে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে। ’
সুনামগঞ্জ জেলা নদী রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ও সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর পওর বিভাগ -১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন,‘ ১১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পুরাতন সুরমা নদীর শাল্লা অংশে ৪০ কিলেমিটার খনন কাজ বাস্তবায়ন চলছে। অধিকাংশ জায়গা খনন হয়ে গেছে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ২৮ কিলোমিটার ও দিরাই উপজেলায় ৩ কিলোমিটারসহ ৩১ কিলোমিটার খননের জন্য পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। গত ১১ মার্চ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহা পরিচালকের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়েছে। এই সভায় পুরাতন সুরমা নদী খননের প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে, সবাই নদীটি খননের জন্য একমত পোষণ করেছেন। আমরা আশা করি পুরাতন সুরমা নদীর এই অংশ খনন হবে এবং আবারও নদী তার গতি ফিরে পাবে।’
নদী সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘নদীগুলোতে পানির সাথে পলিও প্রবাহিত হয়। পানি প্রবাহের জন্য একটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রয়োজন। যে শক্তির সাহায্যে পানি প্রবাহিত হয়ে থাকে সেই শক্তিই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। সেই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কমে গেলে পানি ও পলি অনেক দূর একে বেঁকে চলে। নদীর তল দিয়ে সেলিম্যান্টও প্রবাহিত হয়। বর্ষার পর শীতকালে নদীর পানি ও ¯্রােত কমে গেলে পলি পড়ে নদী ভরাট হতে থাকে। নিয়মিত পলি খনন না হওয়াই নদী ভরাটের অন্যতম কারণ। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস অনুযায়ী অতীতে বর্ষার পরে স্থানীয় জমিদারের নেতৃত্বে নদীগুলোকে কেটে নদী গভীর করা হত। যাতে পরের বর্ষায় পানি প্রবাহিত হতে পারে। তখন সুনামগঞ্জেও এই ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু ৫০-৬০ বছর ধরে অযতেœর কারণেই নদীগুলো ভরাট হয়েছে। নদীর ভরাট অংশ কেটে দিতে হবে। বর্তমান সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে ক্রমান্বয়ে দেশের সমস্ত নদীগুলো পর্যাক্রমে পুর্বের অবস্থায় নিতে যেতে। প্রতিটি জেলায় গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো অগ্রাধিকারভিত্তিতে খনন করা হবে।’
নদী সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন,‘ ভরাটকৃত নদী কেটে পানি প্রবাহ তৈরি করতে হবে। ঢালু তীর রেখে নদী থেকে মাটি কেটে তোলতে হবে। যাতে তীর ভেঙে নদীতে না পড়ে। নদীর পলি মাটি কাটতে হবে পরিকল্পিতভাবে, যাতে নদী থেকে কেটে তোলা মাটি আবার নদীতে না পড়ে। প্রয়োজনে নদীর তীরে কোথাও কিছু জায়গা ভরাট করে বসতবাড়ি ও কোন স্থাপনা তৈরির জন্য প্লাটফর্ম করা যেতে পারে। এতে কেটে তোলা মাটি নদীতে পড়ার সম্ভাবনা কমবে এবং মানুষের উপকারে আসবে। ’
তিনি বলেন,‘ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় নদী খননের পাশাপাশি নদীর সাথে সংযুক্ত সকল খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনে রাস্তা কেটে খাল উদ্ধার করে সেখানে কালভার্ট তৈরির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা আশা করি সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে নদীগুলো পূর্বের গতি ফিরে পাবে।’
ড. আইনুন নিশাত বলেন,‘ নদীর স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে প্রয়োজনে যে এলাকার নদীতে পানি কম রয়েছে সেই এলাকার লোকজনকে পারিশ্রমিক দিয়ে নদী খনন করা যেতে পারে। নদীর সাথে মানুষের সম্পর্কের ও জীবনযাত্রার কথা মাথায় রেখে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পলি খনন করতে হবে। যাতে নদীর তলদেশ থেকে উত্তোলিত পলি দিয়ে কোন উঁচু এলাকায় ফেলে বসতভিটা করা যায়। ’