চরম ভোগান্তিতে ৩৫ গ্রামের মানুষ

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রি ফির কারণে মারাত্বক বেকায়দায় পড়েছে প্রায় ৩৫ টি গ্রামের মানুষ। মাত্রাতিরিক্ত ফি’র কারণে জায়গা-জমি বেচাকেনা বন্ধ রয়েছে উপজেলার এই ৫ মৌজাধীন এলাকায়। এসব স্থানে বিক্রি দর থেকে রেজিস্ট্রি ফি কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় কেউ জমি কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এতে মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারসহ জরুরী চিকিৎসা, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা ও আনুষাঙ্গিক বিশেষ ব্যয় বহনে অক্ষম পরিবারগুলো। এ পরিস্থিতিতে একদিকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে বাড়তি ফি’র কারণে ভূমি বিক্রি করতে না পারা মানুষের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এমন সমস্যা সমাধানে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষেরা।
গত ২১ আগস্ট অতিরিক্ত রেজিস্ট্রি ফি সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে একটি আবেদনও পাঠানো হয়েছে। সাচনা (চৌধুরী বাড়ি) গ্রামের অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী সঞ্জু স্বাক্ষরিত আবেদনে সুপারিশ করেছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এছাড়া এলাকার বেশ ক’জন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের স্বাক্ষরও তাতে রয়েছে। এই আবেদনের মাধ্যমে সবাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন।
আবেদনে জানা যায়, উপজেলার সাচনা, কামলাবাজ, পলক, জামালগড় ও তেলিয়া জামালপুরসহ ৫টি মৌজায় অতিরিক্ত রেজিস্ট্রি ফি নেওয়া হচ্ছে। এতে সমস্যায় পড়েছেন একফসলী এলাকার কৃষিজীবী অনেক পরিবার। যেখানে সাচনা মৌজায় ১ শতক বোরো জমির বিক্রয় মূল্য ৫-৬ হাজার টাকা, সেখানে ফি দিতে হয় ১৪ হাজার ৭৭৯ টাকা। এভাবে কামালবাজ মৌজায় ১ শতক বোরো জমির বিক্রয় মূল্য ৬-৭ হাজার টাকার বিপরীতে ৫৫ হাজার ৭৮৮ টাকা, পলক মৌজার ১ শতক বোরো জমির বিক্রিত মূল্য ৬-৭ হাজার টাকার বিপরীতে ১৫ হাজার ৭৬৭ টাকা, তেলিয়া জামালপুর মৌজার ১ শতক বোরো জমির মূল্য ৫-৬ হাজার টাকার বিপরীতে ৫৫ হাজার ৪৬৭ টাকা এবং জামালগড় মৌজায় ১ শতক বোরো জমির মূল্য ৬-৭ হাজার টাকার বিপরীতে রেজিস্ট্রি ফি গুণতে হয় ৩৩ হাজার ৯০৮ টাকা। এ নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মাঝে অস্বস্তি কাজ করছে।
জানা যায়, সাচনা মৌজার সাচনা, কালী বাড়ি, আলীপুর, রামপুর (একাংশ) ও শরীফপুর, কামলাবাজ মৌজার দক্ষিণ কামলাবাজ, গুলের হাঁটি, শরৎপুর ও সাচনা বাজারের পশ্চিম অংশ, পলক মৌজার পলক, সাচনা বাজার, মফিজনগর, ফতেপুর ও কুকড়াপশি (একাংশ), জামালগড় মৌজার নয়াহালট, তেলিয়া, শাহপুর, উত্তর কামলাবাজ, ছেলাইয়া, মানিগাঁও, চানপুর ও সোনাপুর এবং জামালপুর মৌজার নয়াহালট, উত্তর কামলাবাজ, সোনাপুর, চানপুর, কদমতলী, তেলিয়া (একাংশ), সদরকান্দি ও কামিনীপুরসহ প্রায় ৩৫টি গ্রামের অন্তত ২০-২৫ হাজার পরিবার আছে যারা জরুরী প্রয়োজনে জায়গা-জমি বিক্রি করতে পারছেন না।
কামলাবাজ মৌজার উত্তর কামলাবাজ গ্রামের শাহজাহান সিরাজ বলেন, জামালগঞ্জ সদরে জায়গার যে রেজিস্ট্রি ফি সদর থেকে দূরবর্তী হালি হাওর পারস্থ কামলাবাজ মৌজার ফিও প্রায় সমান সমান। এ মৌজায় যে কয়েকটি গ্রাম আছে সেগুলো অনেক বড় বড় গ্রাম। এর একেকটি গ্রামে দুইটি করে ওয়ার্ড রয়েছে। এছাড়া উপজেলার বৃহৎ হালি হাওরের একাংশও এই মৌজার অন্তর্ভুক্ত। হঠাৎ কেউ গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়ে জমিজমা বিক্রি করতে চাইলে তা সম্ভব হচ্ছে না রেজিস্ট্রি ফি বেশির কারণে। তাই জরুরী ভিত্তিতে তা সংশোধন করা প্রয়োজন।
পলক মৌজাধীন সাচনা বাজার দক্ষিণ অংশের বাসিন্দা আলী আক্কাছ মুরাদ জানিয়েছেন, এই সমস্যার সমাধানের নানা জায়গায় ধরণা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা ভাই-বোনেরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির দ্রুত সুরাহা চান এলাকাবাসী।
সাচনা চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী (সঞ্জু) বলেন, এখানকার মানুষ এক ফসলের উপর নির্ভরশীল। বলতে গেলে কৃষিই তাদের প্রধান পেশা। এর মাঝে কখন যে কোন বিপদ আসে ভর করে তা বলা যায় না। এ বিপদটা হতে পারে বিয়ে কিংবা অসুখ-বিসুখ সংক্রান্ত। কেউ না কেউ প্রতিনিয়তই এমন বিপদের মুখোমুখী হচ্ছেন। বিপদগ্রস্তরা ভূ-সম্পত্তি বিক্রি করতে হণ্যে হয়ে এখানে-সেখানে ছুটেন। কিন্তু অত্যধিক রেজিস্ট্রি ফির কারণে কেউ জমি কেনায় এগিয়ে আসে না। বিপদমুখী মানুষটা চোখে সরষে ফুল দেখেন। এ সমস্যার উত্তোরণ না হলে এখানকার বিপদগ্রস্ত মানুষ দিন দিন আরও সমস্যার সম্মুখীন হবে।
জামালগঞ্জের সাবরেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম চৌধুরী এই বিষয়ে করণিয় প্রসঙ্গে বললেন, নির্দিষ্ট এলাকার ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আবেদন করলে আমি সেটি জেলা রেজিস্টারের কাছে পাঠাব। তিনি এটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অগ্রবর্তী করবেন। উর্ধ্বতন কর্র্তপক্ষ কমিটি গঠন (জেলা রেজিস্টার, সাব রেজিস্টার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে) করে দেবেন। এই কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রস্তাব পাঠাবে। পরে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় রেজিস্ট্রি ফি পূন:নির্ধারণ হতে পারে।