চরম শিক্ষক সংকটে তিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জ জেলায় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় পাঁচটি (নতুন ঘোষিত বিদ্যালয় গুলো ছাড়া)। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ শহরে দুইটি, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। অন্য তিনটি বিদ্যালয়ের দুইটি জগন্নাথপুরে ও একটি তাহিরপুরে।
উপজেলা পর্যায়ে জগন্নাথপুরের দুইটি ও তাহিরপুরের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট চরমে। জগন্নাথপুরের দুইটি বিদ্যালয়ে মাত্র ৩ জন করে ও তাহিরপুরে ৫ জন কর্মরত আছেন। যদিও জেলার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে উচ্চ বিদ্যালয় সরকারিকরণ কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯২৬ সালে জগন্নাথপুরে উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৮৭ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি করা হয়। এরপর বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক অবসরে চলে যান। কিন্তু সরকারিকরণ হওয়ার পর খেকেই শিক্ষক সংকট চলমান রয়েছে।
স্বরূপ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র সংখ্যা ৩৪০ জন। প্রধান শিক্ষকসহ ১০ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন তিনজন সহকারি শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক, সহকারি প্রধান শিক্ষক, বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, ধর্ম, কৃষি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পদ শূন্য রয়েছে অফিস সহকারি ও দুই জন অফিস সহায়কের। শিক্ষক সংকটের কারণে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হওয়ার পরও পাঠদানের জন্য ৫ জন খ-কালীন শিক্ষক রয়েছে। খ-কালীন শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করা হয় ছাত্র ও শিক্ষনুরাগীদের নিকট থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে।
স্বরূপ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরেই এভাবে চলছে। প্রধান শিক্ষক এবং অফিস সহকারি না থাকায় একজন সহকারি শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক ও অফিস সহকারির দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাশাপাশি ওই শিক্ষককে পাঠদানও করতে হয়।
স্বরূপ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক কমিটির সভাপতি আজাদ আলী বলেন,‘ শিক্ষক সংকটের কারণে একসময় স্কুলের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, ছাত্র ছিল না। ৭ বছর আগে তৎকালীন ইউএনও দেবজিৎ সিংহ বাবু স্থানীয়দের নিয়ে সভা করে স্কুলটি পরিচালনায় এগিয়ে আসার আহবান জানান এবং একটি অভিভাবক কমিটি গঠন করে দেন। এরপর থেকে আমাদের অভিভাবক কমিটিই সকলের সহযোগিতায় স্কুলটির শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। শিক্ষক সংকট দূর করার জন্য সকলের কাছে আবেদন করা হয়েছে কিন্তু এখানে কাউকে পদায়ন করা হয় না। কেউ আসলে দ্রুত বদলী হয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেন।’
স্বরূপ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সহকারি শিক্ষক ছায়াদ আলী বলেন,‘ শিক্ষক সংকট অনেক দিনের। অনেকগুলো পদে শিক্ষক না থাকায় আমরা খুবই সমস্যা আছি। এখানে কেউ আসতে চান না আবার পদায়ন করা হলেও থাকতে চান না। প্রধান শিক্ষক, সহকারি প্রধান শিক্ষক ও অফিস সহকারি নেই। আমাকে একাই সব কাজ করতে হয়, পাশাপাশি পাঠদানও দিতে হয়। সরকারি বিদ্যালয় হওয়ার পরও বাধ্য হয়ে খ-কালীন শিক্ষক রাখতে হচ্ছে। শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে বার বার জানিয়ে কোন কাজ হচ্ছে না। এতে শিক্ষার কাঙ্খিত মান অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না।’
জগন্নাথপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৯ সালে। সরকারি হয় ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। নারী শিক্ষার সরকারি এই বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রী সংখ্যা ৩২৩ জন। কিন্তু ৯ জন শিক্ষকের স্থলে আছেন মাত্র ৩ জন। সহকারি প্রধান শিক্ষকসহ পদ শূন্য রয়েছে ৬ জনের। পাশাপাশি অফিস সহকারী ও অফিস সহায়ক নেই দীর্ঘদিন ধরে। পদ শূন্য আছে সহকারি প্রধান শিক্ষক, বাংলা, গণিত, শারীরিক শিক্ষা, ধর্ম ও সমাজ বিজ্ঞানের। পাঠদানের প্রয়োজনে ৪ জন খ-কালীন শিক্ষক রাখা হয়েছে।
জগন্নাথপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনন্ত কুমার সিংহ বলেন,‘৯ জন শিক্ষকের স্থলে আছি মাত্র ৩ জন, ৬ জন শিক্ষকের পদই শূন্য রয়েছে। গণিতের শিক্ষক নেই ৭/৮ বছর ধরে। অফিস সহকারি ও কোন পিয়ন কর্মচারি নেই। প্রধান শিক্ষকইে অফিসের সকল কাজ করতে হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে বার বার শিক্ষক চাওয়া হচ্ছে, কিন্তু কাউকে পদায়ন করা হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আমরা ৪ জন খ-কালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছি। ’
এদিকে তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। এলাকাবাসী বেশ কয়েক বছর আগে বিদ্যালয়টি সরকারি থেকে পুনরায় বেসরকারিকরণের দাবি জানিয়েছিলেন। তারপরও শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি।
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৫০ সালে, সরকারি করা হয় ১৯৮৭ সালে। বর্তমানে ছাত্র সংখ্যা ৭০০ জনের উপরে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষদের পদ ১১টি, কিন্তু শিক্ষক কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে বাংলা, গণিত, ধর্ম, সমাজ বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, শারীরিক শিক্ষায়। অফিস সহকারি ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারির ১টি পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য তিনজন খ-কালীন শিক্ষক রাখা হয়েছে।
তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মইনুল ইসলাম বলেন,‘ হাওরপাড়ের উপজেলার এই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট চলমান রয়েছে। এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদায়ন করা হয় না। উল্টো কয়েকদিন আগে বিজ্ঞানের একজন শিক্ষককে শহরে বদলী করা হয়েছে। পাঠদান দেয়ার মত উপযুক্ত খ-কালীন শিক্ষকও পাওয়া যায় না, আবার শিক্ষকদের সম্মানী দেয়ার ফান্ডও নেই আমাদের। এত সংকট নিয়ে কোনভাবেই ভাল ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয়। ’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন,‘ শুধু সুনামগঞ্জই নয় বৃহত্তর সিলেট বিভাগে শিক্ষক সংকট প্রকট। তবে জগন্নাথপুরের অবস্থা অবাক করার মত। এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছেন। শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব স্যারকে অবগত করেছি। দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসন করা প্রয়োজন।’
জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি) মো. নুরুজ্জামান বলেন,‘ খোঁজ খবর নিয়ে শিক্ষক পদায়নের জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে। ’