চশমখোর সুদখোর ও মানুষের দায় পরিশোধে অনাগ্রহ

গতকালের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের দুইটি সংবাদ শিরোনাম এমন ‘অনুমোদন নেই/ তবুও উচ্চ সুদে ঋণের লেনদেন’ এবং ‘বাজিয়ে বাজনা/ আদায় হয়নি খাজনা’। প্রথম সংবাদটিতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশে ফাইভ স্টার গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা নামের একটি সংগঠনের স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিকট উচ্চ সুদে ঋণ বিতরণের খবর দেয়া আছে। এই সংস্থার এরকম আর্থিক লেনদেন কিংবা ঋণ পরিচালনার কোন অনুমতি নেই বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। যে সংস্থার অনুরূপ কর্মকা- পরিচালনার কোন অনুমোদন নেই সেই সংস্থা কী করে প্রকাশ্যে ঋণ লেনদেন করতে সক্ষম হচ্ছে সেই প্রশ্ন তোলা অবান্তর। কারণ এ ধরনের ব্যক্তিগত বা যেকোন ধরনের সমিতি/সংগঠনের নাম দিয়ে উচ্চ সুদে ঋণ লেনদেনের মতো ঘটনা আখছারই ঘটছে সারা দেশে। সরকারি আলগা নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই এরকম ভুইফোঁড় সংস্থা গজিয়ে উঠে। আসুন একটু পর্যালোচনা করি ফাইভ স্টারের সুদের হার ও ঋণের কিস্তি আদায় প্রসঙ্গে। এরা গ্রাহককে ১০ হাজার টাকা ঋণ দিলে আগেই ১ হাজার টাকা জামানত রাখে। অতঃপর সাপ্তাহিক ১০ কিস্তিতে অর্থাৎ আড়াই মাসে আদায় করে ১১ হাজার টাকা। আড়াই মাসে প্রকৃতপক্ষে হাতে পাওয়া ৯ হাজার টাকার জন্য গ্রাহককে ১ হাজার টাকা সুদ দিতে হচ্ছে। সরল হারে সুদের শতকরা হার দাঁড়ায় ৪৫%। সাপ্তাহিক কিস্তিতে টাকা আদায় করায় প্রতি সপ্তাহেই ঋণের আসলের পরিমাণ হ্রাসপ্রাপ্ত হচ্ছে। কিন্তু সুদ নেয়া হচ্ছে পুরো টাকার উপর হিসাব করেই। এই পদ্ধতিতে সুদের হার দাঁড়ায় প্রায় ৯০% এ। এই ধরনের উচ্চ হারে ঋণের লেনদেন সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাকে কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে পারে সেটি সহজেই অনুমেয়। অর্থাৎ ফাইভস্টারের ঋণের জালে যে একবার আটকা পড়বে তার আর নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণকারী বহু সরকারি/বেসরকারি সংস্থা গ্রামগঞ্জে কম সুদে বিত্তহীন জনগোষ্ঠীকে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে থাকে। এরূপ বহু সংস্থা থাকার পরও মানুষকে কেন সামান্য টাকার জন্য ফাইভস্টারের দারস্থ হতে হয় সেটি গবেষণার বিষয়। বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক বিতরণকৃত ক্ষুদ্র ঋণের আদায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলেই আমরা জানি। ঋণগ্রহীতারা ঋণের কিস্তি পরিশোধে নিদারুণ অনীহা প্রকাশ করেন। এরা বরং এক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বকেয়া রেখে আরেক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণে অতিমাত্রায় উৎসাহী থাকে। গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিলে জানা যাবে একশ্রেণির সুবিধাবাদী লোক একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে সবগুলোরই খেলাপী গ্রাহকে পরিণত হয়েছে। ফলে ওইসব এলাকায় ক্ষুদ্র ঋণের প্রবাহ আটকা পড়ে যাচ্ছে। তাই এখন কোন প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র বা শস্য ঋণ বিতরণে আগ্রহ দেখায় না। এই শূন্যতার কারণেই ফাইভস্টারের মতো চশমখোর সুদখোরদের আমদানি ঘটছে কিনা সেটি অর্থনীতিবিদদের অনুসন্ধানের বিষয়। তবে আমাদের কথা হলো, এমন অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান যাতে অব্যাহতভাবে বেআইনি কর্মকা- পরিচালনা না করতে পারে সে বিষয়ে তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
জগন্নাথপুরে বাজনা বাজিয়ে খাজনা আদায় না করা সংক্রান্ত খবরের নির্গলিতার্থ হচ্ছে, প্রচুর প্রচার প্রচারণা ও তাগাদা দেয়া সত্বেও এবছর ওখানে আদায়যোগ্য ২ কোটি ছয় লাখ টাকা ভূমি উন্নয়ন করের মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৫০% ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা যায়নি। এই ঘটনাটিও পূর্বোক্ত ঋণ পরিশোধে প্রচণ্ড অনাগ্রহের মতো মানুষের কর পরিশোধে অনাগ্রহের বাস্তবতা। মূলত আমাদের যেকোন পর্যায়ের মানুষই নিজের নাগরিক কর্তব্যবোধ সম্পর্কে উদাসীন। সকলেই শুধু পেতে চান, অর্থাৎ অধিকার পাওয়ার বেলায় ষোল আনা কিন্তু কর্তব্য পালনের বেলায় এরাই কাঁচকলা। এই ধরনের নাগরিক সংস্কৃতির ফাঁক গলেই আসে ফাইভ স্টার নামক অবৈধ প্রতিষ্ঠান, বকেয়া পড়ে থাকে ভূমি উন্নয়ন কর।