চাঁদাবাজির বিরোধে দুই পক্ষে বন্দুকযুদ্ধ

বিশেষ প্রতিনিধি ও ছাতক প্রতিনিধি
ছাতকে নৌপথে চাঁদাবাজি ও ফেসবুকে কটুক্তি’র জের ধরে আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের বন্দুক যুদ্ধে ১ জন নিহত এবং ৯ পুলিশসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে ৪০ জন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ছাতকের আওয়ামী লীগ নেতা শামীম চৌধুরীসহ ৯৫ জনের নামোল্লেখ করে ২০০ থেকে ৩০০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে পুলিশ এসল্ট মামলা হয়েছে। পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ্ খান বলেছেন,‘হত্যা মামলার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন।’ ঘটনার পর বুধবার বিকাল পর্যন্ত পুলিশ সংঘর্ষে জড়িত ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছে।
ছাতকের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদী, পাহাড়ী নদী পিয়াইন ও চলতি নদী থেকে দিনে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। লালকার্ড, নীলকার্ড, সবুজ কার্ড, হলুদ কার্ড, শাহ্জালাল পাথর ব্যবসায়ী সমিতি, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, নৌ-পুলিশ, বাংলাদেশ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), ইসলামপুর ইউনিয়ন, নৌযান মালিক সমিতি, নৌযান শ্রমিক সমিতি ও নৌযান ফেডারেশনসহ ১৫ টি রশিদে ছাতকের নদীপথে বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি হয়ে আসছে। এই চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রকও রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীরাই। এরমধ্যে বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের। গত এক সপ্তাহ্ ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা দুই সহোদর ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য শামীম চৌধুরী’র সমর্থকরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একে-অন্যের বিরুদ্ধে কটুক্তি করে আসছিল।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয় টায় এই দুই পক্ষের কয়েক’শ সশস্ত্র সমর্থক আলাদা আলাদা অবস্থান নেয়। ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী’র ঘনিষ্ট হিসাবে পরিচিত পৌরসভার প্যানেল মেয়র তাপস চৌধুরী ও বাগবাড়ির বাসিন্দা আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন চৌধুরী ও পৌর কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন সুমেনের নেতৃত্বে একপক্ষ বাগবাড়ি স্কুলের সামনে এবং শামীম চৌধুরী’র সমর্থকরা তাদের বাগবাড়ি’র বাড়ির সামনে অবস্থান নেয়। পুলিশ ও স্থানীয় গণ্যমান্যরা দুই পক্ষকে প্রায় আধাঘণ্টাব্যাপি কথা বলে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
রাত সাড়ে ৯ টায় ছাতক-সিলেট রোডের জালালিয়া আলিম মাদ্রাসার সামনে থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ মুহূর্তের মধ্যে গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। শহরে আসা লোকজন ছুটাছুটি করে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নেয়। শহরের বাসস্টেশন থেকে ট্রাফিক পয়েন্ট পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে এ সময় উভয় পক্ষে ব্যাপক ইট-পাটকেল, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপসহ শতাধিক রাউ- গুলি বিনিময় হয়। সংঘর্ষ ঠেকাতে পুলিশ ৫২ রাউন্ড টিয়ারগ্যাস এবং ১৬৩ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছুঁড়ে।
সংঘর্ষ চলাকালে শাহাবুদ্দিন (৩০) নামের এক ঠেলা চালক নিহত হন। নিহত শাহাবুদ্দিন শহরের বাগবাড়ি এলাকার আব্দুছ ছোবহানের ছেলে এবং শাহীন-তাপসের সমর্থক।
প্রায় ঘন্টাব্যাপী সংঘর্ষে ছাতক থানার ওসি মোস্তফা কামাল, ওসি (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম, এসআই সৈয়দ আব্দুল মান্নানসহ পুলিশের ৯ সদস্য এবং উভয়পক্ষের আরও কমপক্ষে ৪০ জন গুলিবিদ্ধ হন। সবমিলিয়ে গুলিবিদ্ধের সংখ্যা ৪০ জন। ওসি মোস্তফা কামাল পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
গুরুতর আহত ওসি মোস্তফা কামাল, মেয়রের বড় ভাই কামাল চৌধুরী, ফরহাদ চৌধুরী, আবুল খয়ের টুটুল, সোহাগ দাস, সবরুল হোসেন সাজুকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এছাড়া মুরাদ মিয়া চৌধুরী, শিবলু মিয়া, শাহরাজ মিয়া, আরিফুল ইসলামসহ অন্যান্য আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে মেয়রের বড়ভাই জামাল আহমদ চৌধুরী, কামাল চৌধুরী, চাচা ইলিয়াছ মিয়া চৌধুরী, পল্টু দাস, দেলোয়ার হোসেন, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা সাদমান মাহমুদ সানি, যুবলীগ নেতা রহিম আলী, ছাত্রলীগ নেতা গিয়াস উদ্দিন, কামরুল ইসলাম শাওন. ব্যবসায়ী আশরাফ রাজা চৌধুরীসহ ২৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী বলেন,‘দুই পক্ষই আমার ঘনিষ্টজন। আমি সিলেটে ছিলাম, কারা গুলি করেছে, কী করেছে, আমি বলতে পারবো না, নদীতে যারা চাঁদাবাজি করছে আমি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দেই না, আমি থানার ওসি ও ইউএনও সাহেবকে বলেছি পৌরসভার রশিদ দিয়েও যদি কেউ অতিরিক্ত টাকা আদায় করে তাদেরকে গ্রেফতার করার জন্য।’
পৌর মেয়র আবুল কালামের ঘনিষ্ট হিসাবে পরিচিত একপক্ষের নেতা ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শাহীন চৌধুরী মুঠোফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য যুক্ত করা যায়নি।
এই পক্ষের আরেক নেতা পৌর কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন সুমেন বলেন,‘আমি কারো পক্ষের নয়, শাহীন চৌধুরী পশ্চিম বাগবাড়ি’র বাসিন্দা, আমার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্টতা আছে, এজন্য সকলে আমাকে তাঁর পক্ষের মনে করেন। সংঘর্ষ আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে হয়েছে। একপক্ষের নেতা শাহীন চৌধুরী ও তাপস চৌধুরী। আরেক পক্ষের নেতা শামীম চৌধুরী ও সেলিম চৌধুরী। আমি বিএনপি করি, আমি তাদের কারো পক্ষের নয়।’
শামীম চৌধুরী ও সেলিম চৌধুরী’র মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ্ খান বলেন,‘নদীতে চাঁদাবাজি ও ফেসবুকে কটুক্তি নিয়ে আবুল কালাম চৌধুরী ও তাঁর সহোদর শামীম আহমদ চৌধুরী’র সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে অনেক বৈধ ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়। ছাতক থানার ওসিসহ ৯ পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গুলি খেয়েও পুলিশ সদস্যরা তাদের অবস্থান ধরে রাখে এবং তাৎক্ষণিক আমি পার্শ্ববর্তী দোয়ারাবাজার, জাউয়া, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ এবং জেলা সদর থেকে পুলিশ পাঠানোয় ২ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আসে।’
তিনি জানান, ঠেলাগাড়ি চালক নিহতের ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের হবে। কেউ বাদী না হলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।