চাইল্লায় বাঁধা হটামারা গ্রাম- প্রকৃতির উপাদান দিয়েই প্রকৃতিকে মোকাবিলা

বিন্দু তালুকদার, হটামারা থেকে ফিরে
জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের বৃহত্তর পাগনার হাওরপাড়ের গ্রাম হটামারা। গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই কৃষি ও মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল।
দুর্গম হাওরপাড়ের এই গ্রামের মানুষেরা বেশ সংগ্রামী ও সাহসী। আধুনিক সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত এই গ্রামের মানুষ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে আছে হাওরে।
হাওরের মাঝে গড়ে তোলা গ্রামের বসতভিটা রক্ষায় বছরের প্রায় ৫ মাস হাওরের আফাল (বিশাল ঢেউ) এর সাথে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয় তাদের। বসতভিটা রক্ষায় ইট-পাথরের প্রতিরক্ষা দেওয়াল না থাকায় প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল গ্রামের শত শত পরিবার।
প্রকৃতির উপাদান দিয়েই প্রকৃতিকে মোকাবেলা করছেন তারা। বসতভিটা রক্ষায় প্রকৃতির সাথে ভাঙা-গড়ার খেলায় যুগ যুগ ধরেই এলাকায় রয়ে গেছেন এসব লড়াকু পরিবার।
সম্প্রতি হটামারা গ্রামের দুইটি পাড়া সরেজমিনে পরিদর্শনকালে বসতভিটা রক্ষায় গ্রামবাসীর প্রকৃতির উপদান দিয়েই প্রকৃতির রূদ্র রোষ ঠেকানোর নান্দনিক কৌশল দেখা যায়।
বাঁশ ও চাইল্লা বন (গোলাকার চিকন রশির মত লম্বা বন), যে বন মাটি বা পানির সংস্পর্শে সারা বছরই জীবিত থাকে। সেই চাইল্লা বন দিয়ে হটামারা গ্রামের বাগহাটি ও টইগ্গা হাটির বসতভিটা রক্ষার কৃষকদের হাতেগড়া সুনিপুণ দৃশ্য দেখা যায়। এই দুইটি পাড়ার ১৭০ টির বেশী পরিবার নিজেদের বসতভিটা বাঁশ ও চাইল্লা বন দিয়ে বেঁেধ রেখেছেন।
দেখা যায়, কেউ কেউ বাড়ির পাশে চাইল্লা বন ফেলে তা বাঁশ দিয়ে আটকে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বাঁশ ছাড়াই শুধুমাত্র চাইল্লা বন দিয়ে বসতভিটা বেঁধে দিয়েছেন। চাইল্লা বনের গোড়া বাড়ির দিকে ফেলে দিয়ে এর মাঝে মাটি ফেলে চাইল্লার অপর মাথা ঘুরিয়ে মাটির উপরে নিয়ে এসে এর উপর আবারও মাটি ফেলা হয়। যা এলাকায় বোন্দা নামে পরিচিত। তবে বোন্দা দিতে বেশ লম্বা চাইল্লার প্রয়োজন হয় বলে জানিয়েছেন গ্রামের বাসিন্দা কৃষক ফুল মিয়া। আবার কেউ কেউ বেশী করে চাইল্লা বনের গোড়া হাওরের দিকে দিয়ে বনের মাথায় মাটি দিয়ে চাপা দিয়ে রেখেছেন (যাকে স্থানীয়ভাবে উবদা বলে)।
তবে উবদা দিতে ছোট ও কম লম্বা চাইল্লার প্রয়োজন হয়। উবদা বা বোন্দা দিলে এক সময় সেই চাইল্লা বন পঁচে গিয়ে মাটিতে পরিণত হয় বলে এ প্রতিবেদককে জানান, হটামারা টইগ্গা হাটির বাসিন্দা আবু তাহের।
বৃহত্তর পাগনার হাওরের কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়লেও হটামারা গ্রামের কারো বসতভিটার কোন ক্ষতি হচ্ছে না। ঢেউ আটকে দিচ্ছে বাঁশ ও চাইল্লার তৈরি বাধা (আড়)। তবে বসতভিটা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেলে ঢেউয়ের আঘাতে বাঁশ ও চাইল্লার বাঁধন অকার্যকর হয়ে যায় এবং গ্রাম ভেঙে হাওরে বিলীন হয়ে যায়।
গ্রামবাসীর সাথে আলাপ-আলোচনা করে জানা যায়, এক সময় হাওরপাড়ের প্রতিটি গ্রামের লোকজনই বাঁশ ও চাইল্লা বন দিয়ে আড় বেঁেধ নিজেদের বসতভিটার মাটি রক্ষা করতেন। কিন্তু এখন হাওরের ঢেউ কিছু কমে যাওয়া ও অনেকেই ইট-পাথর দিয়ে ব্লক দিয়ে বসত-ভিটা স্থায়ীভাবে রক্ষা করেছেন। কেউ কেউ অপচনশীল বস্তার ভিতর মাটি ভরে বাড়ির কাছে সারিবদ্ধভাবে ফেলে ভিটা রক্ষা করেন। পরিবেশবাদী সেরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএস ‘কেয়ার বাংলাদেশ’ এর আর্থিক সহযোগিতায় হাওরপাড়ের বেশকিছু ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামকে ঢেউয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা দেওয়াল তৈরি করে দিয়েছেন। কিন্তু হটামারা গ্রামের এই পাড়া প্রতিরক্ষা দেওয়ালের অর্ন্তভূক্ত না হওয়ায় চাইল্লা বনই গ্রামবাসীর ভরসা।
স্থানীয়রা জানান, অতীতে হাওরের অপেক্ষাকৃত উঁচু ও ঢালু পতিত জমিতে বিপুল পরিমাণে চাইল্লা বন পাওয়া যেত। গৃহস্ত পরিবারগুলো বাড়ি রক্ষার পাশাপাশি চাইল্লা বন রোদ দিয়ে শুকিয়ে লাখড়ি হিসেবে ব্যবহার করতেন। হাওর থেকে বছরে দুইবার চাইল্লা বন সংগ্রহ করা হত। প্রথমে হাওরের ধান কাটার পর জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে, এরপর কার্তিক-অগ্রহায়ন মাসে। গৃহস্ত পরিবারে ৬ মাসের জন্য রাখা শ্রমিকরা চাইল্লা বন সংগ্রহ করতেন। হাওরে পানি আসার পর জ্যৈষ্ঠ মাসের সংগ্রহ করা চাইল্লা বন দিয়ে বাড়ি রক্ষার পর অতিরিক্ত চাইল্লা শুকিয়ে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হত। আর হেমন্তের শুরুতে কার্তিক-অগ্রহায়ন মাসে যেসব চাইল্লা সংগ্রহ করা হত তা শুধুমাত্র লাকড়ির কাজের জন্য। চাইল্লা বন সংগ্রহের জন্য প্রতিটি পরিবারের চাহিদামত ছোট-বড় এক বা একাধিক নৌকা ছিল। কিন্তু হাওরপাড়ের সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়া ও পতিত জমিতে চাষাবাদ করার পর আগের মত চাইল্লা বন উৎপন্ন হয় না। তবে কিছু কিছু হাওরের কান্দায় এখনও চাইল্লা বন পাওয়া যায়। আর সেই চাইল্লা বন দিয়ে নিজেদের বসতভিটা রক্ষার সংগ্রাম করেছেন হটামারা গ্রামের মানুষেরা।
নিজেদের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ইট-পাথর দিয়ে বাড়ি রক্ষা না পারলেও হাওরের চাইল্লা ও বাঁশ দিয়েই ভিটে রক্ষায় বিজয়ী হয়েছেন হটামারা গ্রামের দুই পাড়ার প্রায় ১৭০ টিরও বেশী পরিবার।
জানা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও গ্রামের বসতভিটা কমে যাওয়ায় হটামারা পুরাতন গ্রাম থেকে বেশকিছু পরিবার ১৯৯০ সালে গ্রামের পাশের বাগের কান্দায় (পতিত জমি) বসত-বাড়ি তৈরি করেন। পরে ২০০১ সালে পাশের টইগ্গা কান্দায় আরেকটি পাড়া তৈরি করা হয়। কিন্তু বন্যা ও হাওরের বিশাল ঢেউয়ের কারণে দুইটি পাড়াই দুই বার হাওরে বিলীন হয়ে যায়। পরে আবারো দুইটি পাড়া তৈরি করা হয়।
হটামারা গ্রামের টইগ্গা পাড়ার বাসিন্দা স্বাবলম্বী কৃষক সামছুল ইসলাম খোকন বলেন,‘হাওরে বসবাস করা গ্রামের মানুষের জীবন খুব কঠিন। একটি ফসল (ধান) চাষ করতে ৬ মাস কষ্ট করতে হয়। আর ধান কাটার পর চিন্তা একটাই, কিভাবে বসতবাড়ি রক্ষা করা। যাদের টাকা-পয়সা আছে তারা বালু-পাথর দিয়ে ব্লক বা দেওয়াল দিয়ে দেয়। যার পয়সা নেই তাদের চাইল্লা বন’ই ভরসা।’
তিনি বলেন,‘ চাইল্লা বন সংগ্রহ করা খুব কঠিন কাজ। দূরের হাওর থেকে চাইল্লা কাটতে (মাটি থেকে উপরানো) হয়। তার পর নৌকা দিয়ে বাড়ির কাছে আনতে হয়। তারপর বাড়ি বানতে (বাঁধা) হয়। যারা বেশী চাইল্লা আনতে পারে তারা বোন্দা ও উবদা দিতে পারে। কিন্তু সবাই বোন্দা ও উবদা দিতে পারে না।’
তিনি জানান, একসময় হটামারা গ্রামের কাছেই চাইল্লা বন পাওয়া যেত কিন্তু এখন আর পাওয়া যায় না। বর্তমানে দিরাইয়ের রফিনগর ইউপির সমীপুর, গাইজ্জারগাঁও, নোয়াগাঁও গ্রামের কাছ থেকে চাইল্লা বন সংগ্রহ করতে হয়। অতীতে চাইল্লা বন ৫-৭ হাত লম্বা হলেও এখন এত লম্বা বন পাওয়া যায় না।
গ্রামের টইগ্গা পাড়ার নাসির মিয়া বলেন,‘ আমরা গরিব মানুষ। হাওরে জমি চাষ করে পরিবার চলে। ইট-বালু-পাথর দিয়ে ব্লক তৈরি করে বাড়ি রক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তাই হাওরের চাইল্লা বন দিয়েই বাড়ি বাঁিধ। চাইল্লা বনও আগের মত হয় না-পাওয়াও যায় না।’
হটামারা গ্রামের বাগহাটির বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল ইসলাম বলেন,‘গ্রামের জনসংখ্যা বেড়েছে, পুরাতন পাড়ায় থাকার জায়গা কমে গেছে। তাই গ্রামের পাশে প্রথমে বাগের কান্দা ও পরে টইগ্গা কান্দায় আমরা বাড়ি তৈরি করি। কিন্তু প্রতিটি পাড়াই ঢেউয়ের কারণে দুইবার হাওরে বিলীন হয়েছে। গ্রামের লোকজনের অর্থ না থাকায় ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে বাঁধা সম্ভব না। তাই সবাই চাইল্লা বন ও বাঁশ দিয়েই বসতভিটা রক্ষা করেন। কেউ বোন্দা দিয়েছে, আবার কেউ উবদাও দিয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আমরা চাইল্লা বন দিয়েই বাড়ি বেঁধেছি। ’
ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু তালুকদার বলেন,‘শুধু হটামারাই নয় পাশের নাজিমনগরসহ আরো কিছু গ্রাম চাইল্লা বন দিয়েই রক্ষা করা হচ্ছে। অতীতে হাওরপাড়ের সব গ্রামই চাইল্লা বন ও বাঁধ দিয়ে রক্ষা করা হত। কিন্তু যেসব জমিতে চাইল্লা বন উৎপন্ন হত সেসব জমি সরকার বন্দোবস্ত দিয়ে দেওয়ায় এখন সেখানে ধান চাষ করা হয়। বর্তমানে আগের মত চাইল্লা বন পাওয়া যায় না। হাওরে ঢেউও কিছুটা কম, কিছু গ্রাম রক্ষায় সিএনআরএস ও কেয়ার বাংলাদেশ দেওয়াল নির্মাণ করে দিয়েছে। হাওর থেকে বন সংগ্রহ করার নৌকাও নেই অনেকের।’
তিনি আরো বলেন, ‘চাইল্লা বন দিয়ে দুইভাবে বসতবাড়ি বাঁধা হয়। চাইল্লা কম হলে মাটির পাশে চাইল্লা ফেলে বাঁশ দিয়ে বাঁধা হয়। এতে চাইল্লা খুব কম লাগে। আর যারা বেশী চাইল্লা সংগ্রহ করতে পারেন তারা শুধু চাইল্লা দিয়েই বাড়ির ভিটা বেঁধে ফেলেন। তবে এখন শুধু চাইল্লা দিয়েই বাড়ি রক্ষা কঠিন।’
হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটর্ফম এর যুগ্ম আহবায়ক শরিফুজ্জামান শরিফ বলেন,‘হাওরপাড়ের মানুষ তাদের কষ্টার্জিত ফসল বাড়িতেই সংরক্ষণ করেন। মাথা গোঁজা ও হাল-চাষের গবাদিপশুসহ সবকিছু রাখার একমাত্র জায়গা তাদের বসতবাড়ি। সুতরাং তাদের বসতবাড়ি বা বসতভিটা রক্ষায় সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ কৃষকদের এত টাকা নেই যে, তারা বসতভিটা রক্ষায় ইট-পাথর দিয়ে প্রতিরক্ষা দেওয়াল নির্মাণ করবেন। আমরা চাই সরকার থেকে দ্রুত এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হোক। ’