চালক না থাকায় এক বছর ধরে গ্যারেজেই এম্বুলেন্স

বিন্দু তালুকদার
গত ১ মে সকালে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউপির খুজারগাঁও গ্রামের কমলাকান্ত তালুকদার (৬৫)।
এসময় বজ্রপাতে শিকার হয়ে আহত হয়েছিল তার দুই ছেলে প্রিন্স তালুকদার (২০) ও সৈকত তালুকদার (১৪)। আহত দুই ভাইকে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
আহত দুই ভাইকে দ্রুত সিলেট স্থানান্তর করতে খোঁজা হয় এম্বুলেন্স। সরকারি একটি এম্বুলেন্স জামালগঞ্জ হাসপাতালের সামনেই পাওয়া যায় কিন্তু সেটি সিলেটে নেয়া সম্ভব হয়নি।
কারণ এম্বুলেন্স থাকলেও গত এক বছর ধরে এর চালক নেই। তাই হাসপাতালের সামনে গ্যারেজেই তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে সরকারি এম্বুলেন্সটি।
পরে বাধ্য হয়ে সিএনজিতে করেই সিলেটে পাঠানো হয় তাদের। প্রিন্স তালুকদার ও সৈকত তালুকদার আহত হওয়ার পরদিনই ২ মে সকালে বজ্রপাতে একইভাবে আহত হয়েছিলেন পাশ্ববর্তী ভাটি দৌলতপুর গ্রামের সেতু সরকার (৫৫)। তাকে জামালগঞ্জে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে সিলেটে স্থানান্তর করা হলে এম্বুলেন্স না পেয়ে সিএনজি করেই সিলেটে নেন পরিবারের লোকজন।
শুধু প্রিন্স তালুকদার, সৈকত তালুকদার ও সেতু সরকারই নন প্রতিদিনই জামালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মুমূর্ষু রোগীদের সিলেট-সুনামগঞ্জে স্থানান্তর করতে এলাকাবাসীর ভরসা সিএনজি ও প্রাইভেট কার বা লাইটেস।
জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা . মনিসর চৌধুরী বলেন,‘ অনেক দিনে ধরেই এম্বুলেন্সের চালক নেই। এক বছর উপজেলা পরিষদের অর্থে খ-কালীন একজন চালক নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু গত ২০১৭ সালের জুন থেকে কোন চালক না থাকায় এম্বুলেন্সটি গ্যারেজে রয়েছে। এতে মুমূর্ষু রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এম্বুলেন্স না পেয়ে অনেকেই রোগীদের সিএনজিতে করে সিলেট-সুনামগঞ্জে স্থানান্তর করেন। হাসপাতালের এম্বুলেন্সের চালক নিয়োগের জন্য আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছি। কিন্তু এখনও চালক নিয়োগ করা হয়নি। ’
জানা যায়, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য একটি নতুন এম্বুলেন্স প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে এই চালক চাকুরিচ্যুত হলে আর কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। দুই বছর এম্বুলেন্সটি চালান ‘এমএনএইচ’ প্রকল্পের নিয়োগপ্রাপ্ত একজন চালক। পরে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ থেকে খ-কালীন একজন চালক নিয়োগ করা হয়। ওই চালকও এম্বুলেন্সটি এক বছর চালান। এতে উপজেলার বিভিন্ন রোগী সিলেট-সুনামগঞ্জে স্থানান্তর করতে স্বল্পমূল্যে সরকারি এম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ পান।
কিন্তু গত এক বছর ধরে উপজেলা পরিষদ থেকে চালকের নিয়োগ নবায়ন বা অন্য কোন চালক নিয়োগ করা হয়নি। যার কারণে সরকারি এম্বুলেন্সটি এক বছর ধরে হাসপাতালের সামনে গ্যারেজে পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে পরে থাকা এম্বুলেন্সটির যন্ত্রাংশ অকেজো ও মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জামালগঞ্জ উপজেলা সদরের তেলিয়াপাড়ার বাসিন্দা প্রকৌশলী গোলাম জিলানী আফিন্দী রাজু বলেন,‘ অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ সকল সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন সরকারি এম্বুলেন্সটি থাকার পরও ব্যবহার করতে না পেরে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যে কোন প্রকারে একজন চালক নিয়োগ করা প্রয়োজন। কারণ উপজেলা সদরে সরকারি এম্বুলেন্স ছাড়া আর কোন এম্বুলেন্স নেই। তাই রোগী নিয়ে ধনী-গরিব সবারই একই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। প্রয়োজনে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে একজন খ-কালীন চালক নিয়োগ করা হোক। ’
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ রশিদ আহমদ বলেন,‘উপজেলা পরিষদের তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। তারপরও রোগীদের দুর্ভোগ লাঘবে আমরা একবছরের জন্য একজন চালক নিয়োগ করেছিলাম। যে কোন প্রকারে একজন চালক নিয়োগ করা হলে ভাল হত। হাসপাতালের এম্বুলেন্সের চালক না থাকার বিষয়ে বারবার আলোচনা হয়। আগামী সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। ’
সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাশ বলেন,‘ ‘কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প’ থেকে ইতোমধ্যে সারাদেশের জন্য ৫০০ জন চালক নিয়োগ করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি আগামী দুই মাসের মধ্যে জামালগঞ্জ হাসপাতালের এম্বুলেন্সের জন্য একজন চালক নিয়োগ করা হবে।’ এছাড়া সুনামগঞ্জের যেসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এম্বুলেন্স নেই সেগুলোতে এম্বুলেন্স সরবরাহ ও চালক নিয়োগ করা হবে।’