চালের বদলে ধান কেনার দাবি ওঠেছে হাওরাঞ্চলজুড়ে

বিশেষ প্রতিনিধি
সরকারের চাল কেনার সিদ্ধান্তে সুনামগঞ্জের সাড়ে তিন লাখ কৃষকের কোন লাভ হচ্ছে না। অথচ. সরকার সুনামগঞ্জ থেকে যে পরিমাণ চাল কিনছে, এই চালের বদলে ধান কিনে সরকারি উদ্যোগে চাল বানানো হলে, ধানের দাম বেড়ে যেত। কৃষকরাও লাভবান হতো।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের জনপ্রতিনিধি, কৃষক ও কৃষক নেতারা এমন দাবিই করছেন। কৃষকনেতা ও হাওরাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরা বলছেন,‘সরকার চাল কেনার সিদ্ধান্ত বদল না করলে, এটি হবে কৃষকঘাতী কাজ’
সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় সাড়ে তিন লাখ কৃষক বোরো চাষাবাদ করেন। এবার বোরো ধানের চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ১৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে, আবাদ হয়েছে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪০ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ মে.টন ধান। সরকার এই জেলার কৃষকদের কাছ থেকে ৬৫০৮ মে.টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ. চাল কিনবে আতব ১৭ হাজার ৭৯৮ মে.টন এবং সিদ্ধ ১৪ হাজার ১৭৮ মে.টন। এই চাল কেনা হবে জেলার ৩০০ মিলারের কাছ থেকে।
সরকার সাড়ে ৩ লাখ কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলে প্রতি কৃষকের কাছ থেকে ১৮. ৫৯ কেজি ধান কিনতে পারবেন। এই অবস্থায় জেলা ধান ক্রয় কমিটি কেবল প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জেলা খাদ্য অফিসের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন সারা জেলায় ১২ হাজার প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে তারা ধান কিনবেন।
এই অবস্থায় সরকারি ব্যবস্থায় ধান বিক্রির বাইরে থাকা তিন লাখ ৩৮ হাজার কৃষকই চিন্তিত হয়ে ওঠেছেন। তাঁরা ধান বিক্রির জন্য নানা স্থানে ধরণা দিচ্ছেন।
জেলার শাল্লা উপজেলার আঙ্গারুয়া গ্রামের মানবেন্দ্র দাস বললেন,‘চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে ১ মণ ধানের দাম দিয়ে ২ মণ ধান কিনছে। সিদ্ধ চালের কোন মিলই শাল্লায় কিংবা প্রত্যন্ত কোন উপজেলায়ই নেই। সিদ্ধ চাল যে সব মিলাররা দেবে তাঁদের কাছে ভাটি অঞ্চলের কৃষকদের ধান বিক্রির সুযোগই নেই। ছোট ছোট মিল মালিকরা আতব চাল বরাদ্দ পেয়েছে। এঁরা অনেকে ধান কিনে চাল ভাঙাবে না। বড় মিল মালিকদের কাছে বরাদ্দ বিক্রয় করে দেবে, অথবা বিভিন্ন বড় মোকাম থেকে চাল এনে গোদামে সরবরাহ করবে।’ একই ধরনের মন্তব্য করলেন, এই উপজেলার আনন্দপুরের কালা মিয়া তালুকদার ও সুশীল দাস।
সুনামগঞ্জের মিল মালিক সমিতির নেতা, সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম বলেন,‘আমরা ধান কেনায় ধানের বাজার ওঠেছে। এখন সরকার কেনা শুরু করলে আরও দাম বাড়বে ধানের।’ জেলার ৩০০ মিলের মধ্যে ১০-১৫ টি মিল ছাড়া সকলেই এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে তা ভাঙিয়ে বরাদ্দের চাল গোদামে দেবে বলে দাবি করেন তিনি।
জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি জিয়াউল হক বলেন,‘নীতিমালা মোতাবেক চাল কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। আমরা ধান কেনা শুরু করেছি, এখন ধানের দাম বেড়েছে। শনিবার প্রকারভেদে শুকনা ধান ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় কেনা হয়েছে। আধা শুকনা ধান ৬৪০ টাকায় কেনা হয়।’ সিদ্ধ চালের অটো রাইস মিল জেলায় ৪ টি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ধর্মপাশার একটি মিল চুক্তি করেনি। এই অবস্থায় আমার মালিকাধীন হক অটো রাইস মিল, মল্লিকপুরের রাসেল অটো রাইস মিল এবং দিরাইয়ের একটি অটো রাইস মিল ছাড়া কেউ সিদ্ধ চাল দিতে পারবে না। এর মধ্যে দিরাই অটো রাইস মিলের ধান শুকানোর যন্ত্র নেই। তারা ৭৯৮ মে.টন ধান বরাদ্দ পেয়েছে। বাকী চালের মধ্যে হক অটো রাইস মিল ৮০৬২ মে.টন এবং রাসেল অটো রাইস মিল ৫৭০০ মে.টন চাল বরাদ্দ পেয়েছে।’ ব্যবসায়ী জিয়াউল হকও সরকারিভাবে ধান কেনার বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি করলেন।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, চাল কেনার সিদ্ধান্ত অবশ্যই বাতিল করতে হবে। চাল কেনার মতো কৃষকঘাতী সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। গুদামে ধানের সংকুলান না হলে, কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে কৃষকের গোলায় রাখার চুক্তি করা যেতে পারে। গুদাম যখন খালি হবে, তখন কৃষকের কাছ থেকে ধান নেওয়া হবে। কোন কৃষক এই চুক্তিতে ছল-চাতুরি করলে, তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’
হাওরাঞ্চলের উপজেলা শাল্লার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বললেন,‘আমি জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায়ও দাবি তুলেছি, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুলও একই দাবি করেছেন। আমি বলেছি, চাল কেনায় কৃষকদের কোন লাভ হবে না। অনেক চালকল মালিক ধানই কিনবে না, আমদানী করা চাল মিলাররা তাদের গুদামে ঢুকাচ্ছে। সরেজমিনে আমি এরকমই দেখেছি, এই চালই বস্তা পরিবর্তন হয়ে গোদামে যাবে।’
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন,‘প্রায় ৩২ হাজার মে.টন চাল সুনামগঞ্জ থেকে কিনবে সরকার। এই চালের বদলে ধান কিনলে সমস্যা মিটে যায়। ৩২ হাজার মে.টন চাল মিল মালিকদের কাছ থেকে না কিনে, কৃষকদের কাছ থেকে এই পরিমাণ ধান কিনলে ধানের বাজারমূল্য ওঠে যাবে। অনেক মিল মালিক দিনাজপুর-আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন মোকাম থেকে চাল এনে সরকারি গোদামে সরবরাহ করবে। ধান না কিনলে কৃষক সর্বশান্ত হয়ে যাবে। চালের বদলে ধান কেনার বরাদ্দ বাড়াতে হবে।’ তিনি দাবি করলেন, চাল কেনার ক্ষেত্রেও নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা’র কাছে কৃষক-জনপ্রতিনিধিদের দাবির বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে, তিনি বলেন,‘আমরা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করি, সুনামগঞ্জে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলো আমিও খুশী হবো। কোন মিল বরাদ্দকৃত চাল, ধান কিনে নীতিমালা মোতাবেক ভাঙিয়ে সরবরাহ না করলে, সেই মিল কালো তালিকাভুক্ত হবে।’ তিনি জানালেন, অন্যায় সুযোগ নেবার খবর পেলেই আকস্মিক ওই মিলে পরিদর্শনে যাবে খাদ্য অফিসের বিশেষ টিম। জনসাধারণের যে কেউ এধরনের সংবাদ জানিয়েও সহায়তা করতে পারেন খাদ্য বিভাগকে।