চাষীদের আশা জাগিয়েছে চারা উৎপাদনকারী প্রকল্প

বিশেষ প্রতিনিধি
সীমান্তের সবজি প্রধান এলাকায় ‘গ্রীণহিল সিডলিং ফার্ম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গ্রীণ হাউস পদ্ধতিতে বছরব্যাপি উচ্চ ফলনশীল পদ্ধতিতে সবজি চারা উৎপাদন শুরু করেছে। উদ্যোক্তাগণ ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সিলেট বিভাগে চারা উৎপাদনের এমন প্রতিষ্ঠান এটাই প্রথম। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জির পাদদেশের জেলা সুনামগঞ্জের সবজি চাষীদের কাছে আশা জাগানিয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ইতিমধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্ত গ্রাম আমপাড়ায় এক একর জমিতে প্রতিষ্ঠা হয়েছে ‘গ্রীণহিল সিডলিং ফার্ম’। আধুনিক এই পলি হাউসে প্লাস্টিক ট্রেতে মাটির বদলে নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি কোকোপিট প্রক্রিয়াজাত ও জীবানুমুক্ত করে বীজ বপন করা হচ্ছে। রোদের তাপ থেকে চারার সুরক্ষার জন্য ওপরে শেডনেট জুড়ে দিয়ে তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কৃত্রিম উপায়ে। ওই শেডনেট ভেতরের উত্তাপ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে চারার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া গ্রীণ হাউজের ভিতরে রয়েছে কৃত্রিম দাঁড়কাক। কোন ফাকফোকর দিয়ে পোকা ডুকলে ওই দাড়কাঁক শুষে নিবে সহজে। পলি হাউজের ভিতরে উৎপাদিত চারা ২০ দিন পরে রোপনযোগ্য হয়ে ওঠে। এই সপ্তাহে এখানে টমেটো, ফুলকপি, কাছামরিচ, বেগুন ও মিষ্টি কুমরার চারা পাওয়া যাচ্ছে। চারার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দুই থেকে তিন টাকা। লাউ ও করলার দাম রাখা হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকা। স্থানীয় কৃষকরা বললেন, চারদফা বন্যা ও পাহাড়ী ঢলে বীজতলা নষ্ট হওয়ায় দিশেহারা তারা, এই সময়ে গ্রীণহিল সিডলিং ফার্ম উপকারে এসেছে তাদের।
সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের কৃষ্ণনগরের কৃষক আব্দুল আউয়াল জানালেন, এলাকার কৃষকরা চারার জন্য বীজ বপন করেছিলেন। কিন্তু বন্যায় কারো তিন দফা কারো ৪ দফায় বীজতলা ভেসে যাওয়ায় দিশেহারা ছিলেন তারা। এখন অনেকেই গ্রীণহিল সিডলিং ফার্ম থেকে চারা এনে রোপন করছেন। একই মন্তব্য করলেন, এই গ্রামের কৃষক আব্দুল গফুর।
মঙ্গলকাটার কৃষক আব্দুল জলিল জানান, জমিতে প্রথম আলুর বীজ লাগিয়েছিলেন তিনি। তিন দফা বন্যায় পানি ওঠে পঁচে গেছে আলুর বীজ। এখন গ্রীণহিল সিডলিং ফার্ম থেকে ৫০০ ফুলকপি’র চারা এনে একই জমিতে লাগিয়েছেন। আরও কিছু জমি তার আবাদ করা হয়নি। তিনি গ্রীণহিলকে ১৮০০ ফুলকপি’র চারার চাহিদা দিয়েছেন। তারা চারা সরবরাহ করলে ওখানেও ফুলকপিই লাগাবেন তিনি।
প্রকল্পের একজন পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা গাজী নুরুল ইসলাম বললেন, সুনামগঞ্জ হাওরবেষ্টিত জেলা, এখানকার কৃষকরা অতিবৃষ্টি ও অকাল বন্যার কারণে চারা রাখতে পারছেন না। এজন্য আমরা বিকল্প চিন্তা করেছি। আমরা স্থানীয় কৃষক থেকে শুরু করে সিলেট বিভাগের সকল এলাকার সবজি চাষীদের চারা দিয়ে সহযোগিতা করতে চাই। আমরা স্বল্পমূল্যে চারা দেবার চেষ্টা করছি। ভুলত্রুটি সংশোধন করেই এগুচ্ছি আমরা। টমেটো, ফুলকপি, মিষ্টি কুমরাসহ নানা জাতের ২৫ হাজার চারা ইতমধ্যে বিক্রি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান আহমদ বললেন, আধুনিক গ্রীণ হাউসের উপমহাদেশীয় সংস্করণ গ্রীণহিল সিডলিং ফার্ম। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সবজি চারা কীভাবে উৎপাদন করা যায়, সেটার একটা পাইলট প্রকল্প মূলত এটি। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে সবজী চাষাবাদ করেন। তাদের কাছ থেকে ভালো সারা পাওয়া গেছে। আমরা চিন্তা করছি প্রকল্প আরও বড় করবো। এই এলাকায় বেশি পরিমানে বৃষ্টিপাত হয়। মেঘালয়ের পাদদেশে হওয়ায় এখানকার কৃষকরা বীজতলা তৈরি বা চারা উৎপাদনে নানা রকমের প্রতিকূলতার মুখোমুখী হতে হয়। অনেক সময় বৃষ্টিপাতের কারণে বীজতলাই নষ্ট হয়ে যায়। সময়মত চারা উৎপাদন হয় না। আগাম সবজি উৎপাদন করতে ব্যর্থ হন তারা। এ কারণে পরিশ্রমেরও ন্যায্য মূল্য পান না। কৃষকদের এমন অবস্থার চিন্তা করেই এখানে গ্রীণহিল সিডলিং ফার্ম করেছি আমরা।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোস্তফা ইকবাল আজাদ বললেন, আধুনিক প্রক্রিয়ায় সিলেট বিভাগের প্রথম চারা উৎপাদকারী প্রকল্প এটি। এই প্রকল্পে সারা বছর চারা উৎপাদন হবে। অতিবৃষ্টি ও খড়া থেকে চারাকে রক্ষা করা যাবে। এবার চার দফা বন্যায় অনেক কৃষকের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। তারা এখান থেকে চারা নিচ্ছে। আমরা আশা করছি জেলার ২২ হাজার হেক্টরের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই প্রকল্প সহায়ক হবে।