চিকিৎসকগণকে স্পষ্ট অক্ষরে লেখার অভ্যাস রপ্ত করতে হবে

মেডিক্যাল রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট মামলার একটি অপরিহার্য দলিল। বিচারকের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মেডিক্যাল রিপোর্ট বিশাল ভূমিকা রাখে। তাই বিচারালয়ে এই মেডিক্যাল রিপোর্টের গুরুত্ব অনেক বেশি। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দলিল তৈরি করার সময় চিকিৎসা কর্মকর্তারা ততটা সচেতন থাকেন না। প্রচলিত ব্যবস্থায় এই রিপোর্ট হাতে লিখে দাখিল করা হয়। আর চিকিৎসকদের হাতের লেখার বোধগম্যতা নিয়ে তো বহু ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। বিচারক যদি মেডিক্যাল রিপোর্ট সঠিকভাবে পাঠ করতে না পারেন অর্থাৎ রিপোর্টের দুর্বোধ্যতা গুছাতে না পারেন তাহলে নিশ্চয়ই বিচারিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট বটে। হত্যার কারণ, ধরন ইত্যাদি বিষয় বুঝা যায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে। পড়ার অযোগ্য একটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নজরে আসার পর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এখন থেকে স্পষ্ট অক্ষরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন লিখতে চিকিৎসকদের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে প্রতিবেদনের একটি টাইপ কপি প্রতিবেদনের সাথে সংযুক্ত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এই আদেশ দেন। কক্সবাজারের খুরুশখুল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সাইফুল ইসলাম হত্যা মামলার আসামির জামিন আবেদনের উপর শুনানিকালে আদালত এ নির্দেশ প্রদান করেন। এই মামলায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. সুলতান আহমদ সিরাজীর দেওয়া ময়নাতদন্ত রিপোর্ট অস্পষ্ট (পড়ার অযোগ্য) হওয়ায় আদালত এ নির্দেশ দেন। হাইকোর্ট একটি জটিল ও পুরাতন সমস্যার উপর আলোকপাত করে নির্দেশনা দান করেছেন। মেডিক্যাল রিপোর্ট লিখার স্পষ্টতা বিধানের জন্য হাইকোর্টের এই আদেশ সমস্যার সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি।
শুধু মেডিক্যাল রিপোর্ট নয়। চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রের দুর্বোধ্যতা নিয়ে সারা দেশেই বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ফার্মেসির লোকজনই বুঝতে পারেন না বলে শুনা গেছে। ব্যবস্থাপত্র এমনভাবে লেখা উচিত যাতে ঔষধের নাম, পরিমাণ, সেবনের নিয়মাবলি ও রোগীর জন্য চিকিৎসকের উপদেশাবলী সবকিছুই রোগী ও তার স্বজনরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন। কিন্তু এই দেশের হাতে গুনা কিছু চিকিৎসক ছাড়া বাকি কারও ব্যবস্থাপত্র বুঝা এখন রীতিমত বিশেষজ্ঞের কাজ হয়ে গেছে। কিন্তু যখন ফার্মেসির সেলসম্যান নামক ‘বিশেষজ্ঞ’রাও ব্যবস্থাপত্র বুঝতে অক্ষম হন তখন রোগীর অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা সহজেই অনুমেয়। চিকিৎসাক্ষেত্রে বহুবিধ অসংগতির সাথে ব্যবস্থাপত্রের এই দুর্বোধ্যতার বিষয়টিও অন্যতম। সরকার ব্যবস্থাপত্র স্পষ্ট করে লেখার বিষয়ে নির্দেশনা দান করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই নির্দেশনা লংঘিত হয়। চিকিৎসকদের বুঝতে হবে তাঁর নির্দেশনা যদি রোগী বা রোগীর স্বজন বুঝতে না পারেন তাহলে চিকিৎসা বিভ্রাট ঘটতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের তথাকথিত নামযশওয়ালা ব্যস্ত চিকিৎসকরা এটি বুঝতে রাজি নন। এর খেসারত দিতে হয় রোগীকে। হাইকোর্ট যখন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন স্পষ্ট অক্ষরে লেখার নির্দেশনা দান করেন তখন চিকিৎসক সমাজকে এর মর্ম অনুধাবন করে ব্যবস্থাপত্র লেখার ক্ষেত্রেও এই স্পষ্টতা বিধান করতে হবে।
একসময় সমাজের নি¤œস্তরের মানুষের জন্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। সেই সমাজ আমরা পেরিয়ে এসেছি। এখন অন্তত ঘোষিতভাবে মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ টানা হয় না। এমন সময়ে চিকিৎসকদের লেখা যদি রোগী বা রোগীর স্বজন এমনকি বিচারকগণের জন্য অস্পষ্ট করে রাখা হয় তাহলে নিশ্চয়ই সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসকদেরই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাইকোর্টের কথিত আদেশ চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্রকে সুবোধ্য করতে উপযুক্ত ভূমিকা রাখুক এই আমাদের কামনা।